।। শংকরাচার্য ।।
---- স্বামী হরিময়ানন্দ
© ধারাবাহিক রচনা
"এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ
শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্ আলয়ং করুণালয়ম্।
নমামি ভগবদপাদং শংকরম্ লোকশংকরম্।।
====================পর্ব-৬=================
কাশীধাম জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে খুবই প্রসিদ্ধ
ছিল বহুকাল ধরে। কিন্তু আচার্য লক্ষ্য করলেন যে, এই পরম ধর্মের স্থানে নানা প্রকার
আচার অনুষ্ঠান সর্বস্ব ধর্মের উদ্ভব হচ্ছে। শৈব ও তন্ত্র উভয় ধর্মেই কিছু কিছু ভ্রষ্টাচারের
প্রবেশ দেখা যাচ্ছে। ধর্মের নামে নানা প্রকার কু-আচরণ ঢুকে পড়েছে। অনেক শিক্ষিত মা্নুষও
এদের নেতৃত্ব দিয়ে দুষ্ট বাসনার তৃপ্তিতে লিপ্ত ছিলেন। আচার্য শংকর তাদেরকে ধর্মের
মূল বিষয় বোঝাতে প্রবৃত্ত হলেন। কিছু কিছু মানুষকে নিজের মতে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেন।

আচার্য সশিষ্য হাজির হলেন প্রয়াগ তীর্থে। ‘প্র-যাগ’ পরিবর্তিত
হয়ে হয়েছে প্রয়াগ বা প্রয়াগরাজ। ত্রিবেণী গঙ্গা যমুনা ও অন্তঃসলিলা সরস্বতী নদীর সঙ্গমে
এই প্রয়াগ তীর্থ। পরমানন্দে ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান করলেন সকলে। আচার্য স্বরচিত স্তব
পাঠ করে ত্রিবেণীর বন্দনা করলেন। প্রয়াগ তীর্থে থাকলেন কিছু দিন। এখানে লোক মুখে শুনলেন
আচার্য কুমারিল ভট্টের কথা। যিনি বেদের কর্মকাণ্ডী। তিনি এখন তুষের আগুণে প্রবেশের
জন্য আয়োজন করছেন। গুরুবধের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তিনি তুষের আগুণে প্রবেশ করে প্রাণত্যাগ
করবেন ঠিক করেছেন। তাই বহু লোক কুমারিলকে শেষ দেখার জন্য ভীড় করে যাচ্ছেন। আচার্য শংকরও এই কথা শোনা মাত্র শিষ্যদের নিয়ে চললেন।
গিয়ে দেখলেন, বহু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সেখানে হাজির হয়েছেন। প্রভাকর প্রভৃতি শিষ্যদের দ্বারা বেষ্টিত কুমারিল
ভট্ট। তুষের স্তূপের উপরে বসে রয়েছেন আর তুষে
অগ্নি সংযুক্ত করা হয়েছে। তুষের আগুণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ভস্মীভূত
হয়ে যাবেন। আকাশে বাতাসে এক মর্মভেদী হাহাকার।
কুমারিলের কিন্তু কোন মানসিক চঞ্চলতা নেই। প্রসন্ন ভাবে যেন অপেক্ষা করছেন। বিস্মিত
হলেন আচার্য। কী অসীম ধৈর্য! কী প্রখর তেজ!
এই দৃশ্য শংকরকে অভিভূত করল। তিনি স্তম্ভিত হলেন।
কুমারিল এর আগে শংকরকে দর্শন করেননি। কিন্তু তাঁর
প্রতিভার কথা শুনে ছিলেন। দূর থেকে শংকরাচার্যকে দেখে শ্রদ্ধা পূর্ণ চিত্তে নত মস্তকে
অভিবাদন করলেন।শংকরও প্রত্যভিবাদন করলেন। কুমারিল বললেন, আমার এই মহাপ্রস্থানের সময়
আপনার মত যতিবরকে দর্শন করে আনন্দিত হলাম।
আচার্য
বললেন আমি ব্যাসদেবের আদেশে আপনার কাছে এসেছি। অদ্বৈত সিদ্ধান্ত প্রচারের জন্য ব্রহ্মসূত্র,
গীতা ও উপনিষদের ভাষ্য রচনা করেছি। আমার একান্ত ইচ্ছা আপনি এই ভাষ্যের ‘বার্তিক’ রচনা করুন।
কুমারিল এই অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করলেন। এবং আরও জানালেন ইতিমধ্যে তিনি ব্রহ্মসূত্রের প্রথম অধ্যায়ের আট হাজার
শ্লোক বার্তিক রচনা করেছেন। অন্যান্য অধ্যায়ের উপর বার্তিক রচনার ইচ্ছা থাকলেও এখন
আর সময় নেই।
এর পর
কেন তিনি এই ভাবে তুষের স্তূপের ওপর বসে রয়েছেন সে প্রসঙ্গে বলতে শুরু করলেন। তিনি
দুটি অপরাধের জন্য প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ নিজে তুষের আগুণে প্রবেশ করছেন। প্রথম অপরাধ
হল তাঁর বৌদ্ধ গুরুকে বিচারে পরাস্ত করে তাঁর জীবন নাশ করেছেন। দ্বিতীয় অপরাধ হল জৈমিনির
মীমাংসা দর্শন অবলম্বনে ঈশ্বর অসিদ্ধ – এরূপ প্রমাণ
করেছেন।
কুমারিল ভট্ট বলতে লাগলেন - আমার কাছে আর একদম সময়
নেই। অগ্নি দেব আমাকে গ্রাস করার জন্য দ্রুত এগিয়ে আসছেন। তবুও আপনার আমাকে দিয়ে যে
কাজ করতে চান বলে জানালেন, তা আমার শিষ্য মণ্ডন মিশ্রকে দিয়ে করাতে পারেন। তাঁকে বিচারে পরাস্ত করতে পারলে তা আমারই পরাজয় বলে জানবেন।
পণ্ডিতশ্রেষ্ট মণ্ডনকে পরাজিত করতে পারলে আপনার সমস্ত জগৎ জয় করা হবে। আর এক কথা, আপনি
ঐ বিচারে মণ্ডনের স্ত্রী উভয়ভারতীকে মধ্যস্থ করতে পারেন। তিনি ঋষি দুর্বাসার দ্বারা
অভিশপ্ত দেবী সরস্বতী। তিনি চার বেদ ও ষড়দর্শন
সহ বহু শাস্ত্র বিশারদ। মণ্ডনকে পরাজিত করে অদ্বৈত মতে নিয়ে আসতে পারলে সেই আপনার ভাষ্যের
বার্তিক রচনা করতে পারবে।
কুমারিল শংকরকে বললেন, হে যতিরাজ, আমার কিছু কথা
আপনাকে দ্রুত নিবেদন করছি, দয়া করে তা শুনুন। এখানে বৌদ্ধগণ প্রবল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
তার ফলে বৈদিক ধর্ম খানিকটা ম্লান হয়ে পড়েছে।
মানুষের মনে ধর্মের প্রতি নাস্তিক্যভাব ও বেদের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখা যায়। আমি তখন রাজগীরে
যাই। রাজাকে বশীভূত করে বেদ প্রমাণ মিথ্যা বিশ্বাস করিয়েছিলেন। আমি তখন বৌদ্ধদেরকে
পরাস্ত করতে উদ্যত হই। যেহেতু আমি বৌদ্ধদের মতবাদ ভালো জানতাম না, তাই তা জানবার জন্য
তাদের শরণ নিলাম। খুব যত্ন করে তাদের শাস্ত্র গ্রন্থ সকল পাঠ করতে লাগলাম। বৌদ্ধ সিদ্ধান্ত সকলের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এক সময় এমন হল যে, আমি
সেই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে বেদের মতকে দোষারোপ করতে শুরু করলাম। পরে এই দুর্বুদ্ধির
জন্য আমার খুব অনুতাপ হল। আমি খুব মনের কষ্টে কাঁদতে থাকি। আমার এই দুর্বলতা লক্ষ্য
করে বৌদ্ধগণ আমার প্রতি শত্রুতা করতে থাকে। তারা যুক্তি পরামর্শ করে ঠিক করল যে আমাকে
প্রাণে মেরে ফেলবে। তা না হলে আমি তাদের মতকে দূষিত করতে পারি।
এক সময় তারা আমাকে উন্মাদ মনে করে উঁচু অট্টালিকার
উপর থেকে থাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সেই সময় আমি চিৎকার করে বলি, “যদি বেদ
প্রমাণ হয় তবে আমি নিশ্চয় জীবিত থাকব”। ‘যদি’ এই সংশয়
সূচক শব্দের জন্য হোক বা অতি উঁচু বলেই হোক আমার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। আমি একদিকে গুরুর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছি ও অন্যদিকে ঈশ্বরের
প্রতি অবিশ্বাস প্রকট করেছি। এই দুই অপরাধের জন্য আমি শাস্ত্রের নির্দিষ্ট বিধি অনুসারে
এই তুষানলে প্রবেশ করেছি। সৌভাগ্য যে এই সময় আপনার মতো যতিশ্রেষ্ঠের দর্শন লাভ হল।
আমার ইচ্ছা ছিল আমি
আপনার রচিত ভাষ্যের উপর ‘বার্তিক’ রচনা করে
যশলাভ করব। কিন্তু সে আশা পূর্ণ হবে না। আমি জানি আপনি স্বয়ং মহাদেব। অদ্বৈত জ্ঞান
প্রচারের জন্য শরীর ধারণ করেছেন।
এই কথা শুনে শংকর কুমারিল
ভট্টকে বললেন, তুমি বৌদ্ধদের মতকে খণ্ডন করতে অগ্রসর হয়েছিলে, এ কাজে তোমার কী অপরাধ
! আমি তোমাকে জীবন দান করছি, তুমি আমার ভাষ্যের
উপর বার্তিক রচনা কর।
শংকরের কৃপার কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন। আপনার
আশীর্বাদে তা অসম্ভব নয় জানি। কিন্তু তবুও আমি আমার সংকল্প ত্যাগ করব না। তাই বললাম
যদি আপনি অদ্বৈত প্রচার করতে চান তবে মণ্ডন মিশ্রের কাছে যান। তাকে পরাস্ত না করলে
আপনার প্রচার কাজ সম্পূর্ণ হবে না। তাঁর সমকক্ষ বেদ বেদান্তের পণ্ডিত আর কেউ নেই। তিনি
প্রবৃত্তি মার্গের প্রচার করেন। নিবৃত্তি মার্গ স্বীকার করেন না। আচার্য আপনি এখন কাল
বিলম্ব না করে মন্ডনের কাছে যান। আর আমাকে
অদ্বৈত ব্রহ্মের উপদেশ দান করুন যার ফলে আমি ব্রহ্মে বুদ্ধি স্থির করে দেহ ত্যাগ
করতে পারি।
তাই হল। আচার্য কুমারিল
ভট্ট ধ্যানস্থ হয়ে পরমাত্মার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলেন। আদর্শ এক সাধক ও পণ্ডিত ধর্ম
রক্ষার জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করলেন। জগতের ইতিহাসে এই দৃষ্টান্ত চির অম্লান হয়ে
থাকবে। ব্রহ্মলীন হলেন কুমারিল ভট্ট।
contd....
খুব সুন্দর আচার্য শংকর লেখা বিস্তারিতভাবে জানতে পারছি জেনে খুবই ভালো লাগছে আপনার শ্রী চরণে অনন্ত কোটি প্রণাম জানাই।
ReplyDeleteভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানাই আচার্য্য 🙏🙏🙏
Deleteমৌসুমী রায় কোচবিহার।
Pronum Maharaj khubi bhalo laglo Achajyo Sankarer lekhati porre parabarti parber apekshay railum .
Deleteপ্রণাম প্রভুজি, আচার্য্য শঙ্কর এর লেখাটিকে খুবই ভালো লাগলো।অনেক কিছু জানা গেলো, পরবর্তী অংশের অপেক্ষায় রইলাম।।
Delete🌹🌻🙏🙏🙏🌻🌹
আভূমিলুণ্ঠিত প্রণাম জানাই পরম পূজনীয় আচার্য শংকর ও পরম পূজনীয় আচার্য কুমারিল ভট্ট কে । ভীষণ ভাল লাগল মহারাজ বহুদিন পর পূজনীয় শংকরাচার্যের ওপর আপনার লেখা ব্লগ পড়ে । আমাদের আন্তরিক ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করুন মহারাজ 🙏🌷🙏🌷🙏🌷🙏🌷🙏 সুমিত্রা সরকার, লেকটাউন 🙏🙏🙏🙏
ReplyDeleteশ্রদ্ধা পূর্ণ প্রণাম জানাই আচার্য্য শঙ্কর
ReplyDeleteও কুমারীল ভট্টাচাৰ্য কে 🙏
ভীষণ ভালো লাগলো আচার্য্য শঙ্করের জীবনী পড়ে, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা পূর্ণ প্রণাম নেবেন মহারাজজী 🌷🙏🌷
আচার্য শঙ্কর ও আচার্য কুমারিল ভট্ট এর শ্রীপাদপদ্মে ভক্তিপূর্ণ প্রনাম নিবেদন করি 🌷🌷🌼🌼🙏🏼🙏🏼। স্বভক্তি প্রণাম আচার্য গুরুদেব 🌼🌼🌷🌷🙏🏼🙏🏼। আচার্যদেব, অপূর্ব সুন্দর আপনার এই লেখনির উপস্থাপনা 🌷🌷🙏🏼🙏🏼। আচার্য্য কুমারিল এর একজন আদর্শ সাধক ও সত্য ধর্ম রক্ষার এক আদর্শ নিদর্শন স্বরূপ 🌷🌷🙏🏼🙏🏼।
ReplyDeleteপার্বতী ব্যানার্জী, শিলিগুড়ি।
খুব ভালো লাগছে আচার্য শংকর এর জীবনী। প্রণাম নেবেন মহারাজ 🙏🙏। শুভ্রা লালা।
ReplyDeleteআচার্য্য শঙ্করের জীবনী জানতে পারছি খুব ভালো লাগছে আমার আন্তরিক ভক্তি পূর্ণ প্রনাম জানাই মহারাজের চরণে অঞ্জু শ্রী মুখার্জী
ReplyDeleteAcharya Shankar er kahini khoob valo laglo Maharaj 🙏 Pronam Maharaj apnar chorone ..Joy Acharya Shankar 🙏🙏
ReplyDelete🙏🙏🌹🌹🍂🍂☘️☘️
ReplyDeleteShampa Dhar 🙏🙏🌹🌹🍂🍂☘️☘️
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো মহারাজ।
ReplyDeleteকত কিছু জানতে পারি মহারাজ জীর লেখা পড়ে খুব ভালো লাগে পড়তে । রুনা পালিত কেঁচুয়াডাঙ্গা নদীয়া I
ReplyDeleteসবই অজানা।আপনার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সব জানতে পারলাম। সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন। 🙏🏻💐
ReplyDeleteরুবী ভট্টাচার্য ইছাপুর
খুব ভালো লাগছে আচার্য শংকর সম্পর্কে জানতে পেরে। প্রণাম মহারাজ।
ReplyDeleteআচার্য শঙ্করের জীবনী জানতে পারছি খুব ভাল লাগছে। অনেক কিছু জানতাম না।আপনার সংস্পর্শে এসে সমৃদ্ধ হচ্ছি।প্রণাম মহারাজ🙏🙏ভাল থাকবেন।মধুমিতা মুখার্জী দক্ষিনেশ্বর
ReplyDeleteApurba laglo Acharya Shankar er
ReplyDeleteJibani parba 6 pare. Aro icche hocche jante. Pranam Maharaj 🙏
Pulakesh sinha Roy
DeleteMaharaj khub valo lagche porte, opekkhay roilam porer tar jonno.
ReplyDeleteFeeling so happy to learn about this Great man.....thanks a lot Maharaj for providing us such a precious information ....pls keep on writing
ReplyDelete