শংকরাচার্য ।। পর্ব - ৯ ।। স্বামী হরিময়ানন্দ

                          ।।  শংকরাচার্য ।।                                                                                                 ---- স্বামী হরিময়ানন্দ © ধারাবাহিক রচনা "এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্‌ আলয়ং করুণালয়ম্‌। নমামি ভগবদপাদং শংকরম্‌ লোকশংকরম্‌। =============পর্ব-৯============= মণ্ডণ পত্নী উভয় ভারতী দেবী সরস্বতীর সমতুল্য ছিলেন মণ্ডনের পত্নী। যিনি এই   বিতর্ক সভার মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এখন বললেন, হে যতীশ্বর, আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন - এ কথা সত্য। কিন্তু   আমাকে পরাজিত না করলে আপনার পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। আমি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী, কাজেই আপনার অর্ধেক বিজয় হয়েছে, সম্পূর্ণ নয়। আচার্...

ভক্তির অবতার শ্রীচৈতন্য ।। পর্ব - 39 (NEW)

                              ভক্তির অবতার শ্রীচৈতন্য 



                   ©                                                           --- স্বামী হরিময়ানন্দ

ধারাবাহিক রচনা

                  চৈতন্যদেব ভক্তির অবতার; জীবকে ভক্তি শিখাতে এসেছিলেন। - শ্রীরামকৃষ্ণ 

                  ========================= পর্ব-৩৯ ====================

      ভগবানের প্রতি কত ভালোবাসা এলে এমন ভাব হয়, অবাক হয়ে আমরা কেবল ভাবি। রাতের পর রাত কত গভীর সাধন ভজনে চৈতন্যদেবের মন মগ্ন থেকেছে। তবেই এমন ভাব-ভক্তিলাভ সম্ভব হয়েছে । এমন ভক্তি-ভাব সাধারণের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

  রাতের অর্ধেক কেটে যেত কৃষ্ণ-কথা আলোচনা করে। স্বরূপ ও রামানন্দ রায় কৃষ্ণ কথা শ্রবণ করিয়ে গভীর রাতে চৈতন্যদেবকে শয়ন করিয়ে ফিরে যেতেন নিজের কুঠিয়াতে। রামানন্দ নিজের গৃহে চলে যেতেন।আর স্বরূপ মহাপ্রভুর কুঠিয়ার কাছেই থাকতেন। গোবিন্দ রাতে কুঠিয়ার দ্বারে শুয়ে থাকতেন।

   একদিন গভীর রাতে গোবিন্দ চৈতন্যদেবের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে স্বরূপকে খবর দেন। স্বরূপ সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন কিন্তু কুঠিয়াতে তাঁকে দেখতে পেলেন না। খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। মশাল নিয়ে চারিদিকে খুঁজতে শুরু করলেন। কাশী মিশ্রের বাড়ির বাগানের যে অংশে কুঠিয়া তার চার দিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীরের মধ্যে তিন দিকে দরজা। তাঁরা দেখলেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা। প্রাচীরের বাইরে গেলে দরজা অবশ্যই খোলা থাকত। কিন্তু আশ্চর্য ভেতরে কোথাও তাঁকে পাওয়া গেল না।  এখানে ওখানে নানা জায়গায় খোঁজা হল। অবশেষে গেলেন শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে। সেখানে গিয়ে দেখেন সিংহদ্বারে  গাভীদের মধ্যে প্রভু পড়ে রয়েছেন। হাত পা সব গুটিয়ে কূর্মের মতো হয়ে গেছে। মুখে হাসি আর দু চোখে জলের ধারা। অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছেন। গাভীরা চারিদিকে শুঁকছে। অনেকক্ষণ পরে প্রভুর ভাব শান্ত  হলে, তাঁকে আবার কুঠিয়াতে নিয়ে আসা হয়। কুঠিয়াতে সকলে ভগবানের নাম সংকীর্তন করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ নাম শোনানোর পর চৈতন্যদেব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন।

   আর একদিন শরত কালের কথা। পরিষ্কার আকাশে চাঁদ উঠেছে। চারিদিকে চাঁদের আলোতে স্বপ্ন-রাজ্যের আকার নিয়েছে। বিভিন্ন সুগন্ধী ফুল যুথী, মালতী, শেফালির গন্ধে চারিদিক ভরপুর। এমন মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমস্ত সুন্দরের যিনি উৎস, চিরসুন্দর শ্রীভগবানকে দর্শনের ইচ্ছা মনে জাগে। এমনি শারদীয়া রাতে প্রেমময় ভগবান ভক্তের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন রাসলীলাতে। শ্রীচৈতন্যদেব এই সব রাতে ঘুমোতে যাওয়া দূরের কথা, ঠিক মতো স্থির  হয়ে বসতেও পারতেন না। সারারাত কৃষ্ণকথা শ্রবণ করে কাটিয়ে দিতেন। কোনও কোনও রাতে কৃষ্ণপ্রেয়সী ব্রজগোপীর ভাবে অন্তরঙ্গদের নিয়ে পুরীর উপবনে ঘুরে কাটাতেন। ভাব যখন আরও গভীর হত তিনি নিজেকে এবং এই দৃশ্যমান জগৎ সবই ভুলে যেতেন। ভাব খানিকটা প্রশমিত হলে ভক্তদের ওই সব প্রসঙ্গ বর্ণনা করতেন। ভক্তরাও অবাক বিস্ময়ে তা শ্রবণ করে জীবন সার্থক করতেন।

   একদিন ঐ রকম শরতের রাতে পরিবেশ অপূর্ব সৌন্দর্য মণ্ডিত হলে চৈতন্যদেব সন্ন্যাসীদের নিয়ে পুরীর উপবনে প্রবেশ করলেন। সকলেরই মন অন্তর্মুখী ও চিত্তে বৃন্দাবন লীলার চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে। সকলে এক জায়গায় বসে ধ্যান শুরু করলেন। হঠাৎ স্বরূপের লক্ষ্য পড়ল চৈতন্যদেব সেখানে নেই। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন, নেই। উঠে এখানে ওখানে দেখলেন, বাগানের ভেতরে দেখলেন, কোথাও নেই। খুব চিন্তিত হয়ে নিজে ও কিছু ভক্তদেরও পাঠালেন খুঁজতে।

   এদিকে চৈতন্যদেব সকলের অলক্ষ্যে বিদ্যুৎ গতিতে বাগান থেকে বেরিয়ে চন্দ্রালোকে যমুনা তীরে গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ জলকেলি করছেন এরূপ দর্শন করে যমুনা ভেবে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সমুদ্রে তখন ভাটার টান চলছে। ভাটার টানে চৈতন্যদেবের দেহ সমুদ্রে ভেসে গেছে। শ্রীকৃষ্ণের ভাবে তখন অন্তর্দশা। দেহাত্মবুদ্ধি একেবারে শূন্য। বাইরে থেকে দেখলে মৃত শরীরের মতো দেখতে।

   রাতে মাছ ধরবার জন্য জেলে সমুদ্রে জাল পেতে বসেছিল। ভাটার টানে অসাড় দেহ ভেসে এসে জালে আটকে যায়। জেলে বড় মাছ ভেবে টেনে তীরে নিয়ে আসে। কিন্তু ভালো করে দেখে বুঝতে পারল এ মাছ নয়, মানুষের দেহ। জেলের ভয়ের ও আতঙ্কের সীমা রইল না।

    কোন রকমে জাল থেকে খুলে অসাড় দেহ বালির উপর রাখল। শরীর স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহে শিহরণ হল। ভূতে পেলে মানুষের যেমন অবস্থা হয়, জেলের অবস্থা তখন সেরকম। মুখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হরি নাম বেরিয়ে আসছে। সেই অবস্থায় সে ভয়ে তাড়াতাড়ি জাল গুটিয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিল। ভাল করে চলতেও পারছিল না। যেন একটা আবেশের মধ্যে সব কিছু ঘটে যাচ্ছে। শেষে নিজেকে সামলাতে না পেরে কখনও কাঁদতে লাগল, কখনও হাসতে লাগল। মুখে কিন্তু অবিরাম হরিনাম।

       এদিকে  স্বরূপ কিছু সঙ্গীদের নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে ঐ দিকে আসছিলেন। জেলেকে ঐ রকম ভাবে পাগলের মতো আচরণ করতে দেখে তারা অবাক হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন কেন এমন করছ? কারও সঙ্গে এই রাস্তায় কি দেখা হয়েছে? জেলে তখন খুব কাতর হয়ে বলল, ঠাকুর, আমি আজ বড় বিপদে পড়েছি। রোজ রাতে আমি জাল পেতে সমুদ্রে মাছ ধরি। সারা জীবনে এমন বিপদে কোন দিন পড়িনি। আজ রাতে আমার জালে একটা মড়া আটকে ছিল। সেটা কোন রকমে টেনে তুলতে তার ভেতরের ভূতটা আমাকে চেপে ধরেছে। কিছুতেই ছাড়ছে না। কত ভগবানের নাম নিচ্ছি, কিছু হচ্ছে না। আমার এখন একজন ওঝার দরকার, ভূত ছাড়ানোর জন্য।

    স্বরূপ খুব বুদ্ধিমান। বললেন, তোমার কোন ভয় নেই। আমি খুব বড় ওঝা। তোমার ভূত এখনই ছাড়িয়ে দিচ্ছি। এই বলে স্বরূপ জেলের মাথায় হাত রাখলেন ও মন্ত্র পড়ে বললেন তোমার ভূত চলে গেছে।

 জেলে একটু শান্ত হয়ে বসলেন। স্বরূপ দামোদর তখন বললেন তুমি যাঁকে জালে পেয়েছ তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। ভগবৎ ভাবে জ্ঞান হারিয়ে সমুদ্রে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে থাকবেন। সেই ভগবৎ আবেশের দেহ স্পর্শ করে তোমার মধ্যে হরি-প্রেমের উদয় হয়েছে। এ ভূতের আবেশ নয়। আমরা তাঁকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে এই দিকে আসছিলাম। কোথায় রেখেছ আমাদের তাড়াতাড়ি সেখানে নিয়ে চল। স্বরূপের কথায় জেলে (কেউট স্থানীয় ভাষায়) খুব অবাক হলেন । জেলে বললেন  এই দেহ চৈতন্যদেবের হতে পারে না। কারণ সেটি খুবই দীর্ঘ ও বিকৃত আকৃতির ছিল। সকলে মিলে সেই দেহের কাছে গেল, যেখানে বালির উপর জেলে দেহটি রেখেছিল।

   মহাপ্রভুকে ঐ ভাবে বালির উপর শোয়ানো দেখে, প্রাণের আরাধ্য দেবতাকে ওই ভাবে দেখে ভক্তদের চোখে জল এল। স্বরূপ নিজেকে সামলে নিয়ে খুব সাবধানে দেহটি ধরে তুললেন। বালি ঝেড়ে পরিষ্কার করলেন। নিজের উত্তরীয় বালির উপর বিছিয়ে দিয়ে তার উপর শুইয়ে দিলেন। ভেজা কৌপিন পরিবর্তন করে দিলেন। উপস্থিত ভক্তেরা সকলে জোরে জোরে হরিনাম করতে লাগলেন। মধুর সেই হরিনাম আকাশ বাতাস ও বিস্তীর্ণ সমুদ্রের গভীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। ভালো করে স্বরূপ পরীক্ষা করে দেখে বুঝলেন গভীর অন্তর্দশা। তাঁর কানে জোরে জোরে কৃষ্ণনাম শোনাতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে দেহে চেতনা ফিরে এল। সকলের প্রাণে শান্তি হল। আরও কিছুক্ষণ পর চৈতন্যদেব উঠে বসলেন, যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। কিন্তু তখনও সম্পূর্ণ বাহ্য জগতে মন নেই। একে বলে অর্ধবাহ্য দশা।

   শ্রীচৈতন্যদেব  সর্বদা তিন রকম অবস্থায় থাকতেন। অন্তর্দশা, অর্ধবাহ্য দশা, বাহ্যদশা। যখন ভগবানের সঙ্গে পূর্ণ মিলিত হন, মন বুদ্ধি সম্পূর্ণ ঈশ্বরে লীন হয়, দেহাত্মবুদ্ধি বিন্দুমাত্র থাকে না। দেহ তখন বাইরের জড়বস্তুর মত মনে হয়। তখন কোন কথাবার্তা বাহ্যিক কোন কিছু থাকে না। এটি হল অন্তর্দশা। অর্ধবাহ্য দশায় দেহে চেতনা আসে কিন্তু তখন ভাব সমাধিতে থাকে, বাহ্য জগতে মন থাকে না। মন আরও নিচে নামলে তখন বাহ্য জগতের জ্ঞান হয়। তখন ইন্দ্রিয় ও দেহের কাজ হয়।

   স্বরূপ বুঝতে পারতেন এই সব অবস্থা। চৈতন্যদেবের মুখে আধ আধ অতীন্দ্রিয় জগতের কথা শুনে ও সেই দর্শনের ফলে তাঁর মুখে যে দীপ্তি ফুটে উঠেছিল তা দেখে ভক্তরা আনন্দিত হলেন। আরও খানিকক্ষণ পরে ক্রমে ক্রমে মন বাহ্য অবস্থায় এলে মহাপ্রভু সহ সকলে মিলে কূঠিয়াতে ফিরে এলেন।

    আগেই বলেছি চৈতন্যদেব গভীর ঈশ্বরীয় ভাবে নিমগ্ন থাকলেও মাঝে মাঝে শচীমায়ের খবরা খবর নিতেন। পণ্ডিত জগদানন্দ বঙ্গদেশে এলে তিনি তাঁর মাধ্যমে খবর নিতেন। নন্দোৎসবের দিনে শ্রীজগন্নাথের প্রসাদী মূল্যবান বস্ত্র চৈতন্যদেবের জন্য আসত। তিনি সেই প্রসাদী বস্ত্র মায়ের জন্য পাঠাতেন। সঙ্গে ভালো ভালো মহাপ্রসাদও পাঠাতেন। নবদ্বীপের প্রিয় ভক্তদের জন্যও মহাপ্রসাদ মালাচন্দন ইত্যাদি পাঠাতেন। একবার জগদানন্দ ঐ ভাবে নবদ্বীপে গিয়ে শচীমাতাকে দর্শন করে শান্তিপুরে অদ্বৈতাচার্যের কাছে দেখা করতে যান। তখন আচার্য বৃদ্ধ হয়েছেন। কুশল সংবাদ নেওয়ার পর আচার্য একটি বিষয় চৈতন্যদেবকে জানাতে বলেন। কিন্তু সেটি এমন ভাষায় বলেন, অন্য কেউ বুঝতে পারবেন না। একমাত্র চৈতন্যদেব ছাড়া এ ভাষা অন্য কেউ বুঝবেন না। এই কথায় কিছু ইঙ্গিত হয়তো রয়েছে, যা সাধারণের বোঝা দুঃসাধ্য।

আচার্য বললেন -

 বাউলকে কহিও লোকে হইল আউল।

বাউলেরে কহিও হাটে না বিকায় চাউল।।

বাউলকে কহিও কাজে নাহিক আউল।

বাউলকে কহিও ইহা কহিতেছে আউল।।

  আচার্যের মুখে এই সব হেঁয়ালি শুনে জগদানন্দ হাসলেন। পুরীতে ফিরে এসে চৈতন্যদেবকে তা শোনালেন।

      চৈতন্যদেবও  শুনে প্রথমে একটু হাসলেন। তারপর মৌন হয়ে গেলেন। স্বরূপও শুনলেন। কিছু না বুঝতে পেরে অবাক হলেন। চৈতন্যদেবের কাছে এর অর্থ জানতে চাইলেন। চৈতন্যদেব এর গভীর অর্থ নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু সকলের সামনে শুধু এই টুকু বললেন আমিও এর ঠিক অর্থ বুঝতে পারছি না। তবে, আচার্য আগম শাস্ত্রে পণ্ডিত। পূজা উপাসনার জন্য দেবতার আরাধনা করেন। পূজা শেষ হলে দেবতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়। এই কথা শুনে ভক্তরা খুবই বিস্মিত হলেন। এই কথা শুনে কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলেন স্বরূপ দামোদর।

  কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে চৈতন্যদেবের ব্যাকুলতা অনেক গুণে বেড়ে গেল। শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন থেকে যখন মথুরাতে চলে যান সে সময় শ্রীমতী রাধার অন্তরে যেমন তীব্র ব্যাকুল ভাব হয়েছিল, এ যেন সেই ভাব। অন্তরে সর্বদাই বিরহ ভাব ও তার ফলে অদ্ভুত প্রেমবিকার প্রকাশ পেয়েছিল। কখনও কখনও স্বরূপ বা রামানন্দকে কাছে পেলে সেই ভাব প্রকাশ করতেন। তাঁরাও সব সময় কাছে থেকে ঐ ভাবের শ্লোক বা সঙ্গীত পরিবেশন করে সান্ত্বনা দিতেন।

   শাস্ত্রে এই ভাব বা অবস্থাকে তপ্ত ইক্ষু চর্বণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মুখ জ্বলে যায় অথচ আস্বাদন করতে  মন চায়। বিষ আর অমৃতের একত্র মিলন। চৈতন্যদেবের দেহ, বাক্য ও মনে প্রেমের এই অপূর্ব ভাবের প্রকাশ দেখতে পেয়ে অন্তরঙ্গ ভক্তরা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করলেন। হাজার শাস্ত্র পাঠ করেও যা ধারণা করা যায় না, ভগবৎ বিরহের ব্যাকুল আর্তি প্রভুর শরীরে দেখতে পেয়ে তাদের আনন্দ হল। আবার কষ্টও হল এই জন্য যে, অনাহারে অনিদ্রায় শরীর দিনে দিনে ক্ষীণ হয়ে আসছে। সেই ক্ষীণ শরীর দেখে ভক্তদের দুঃখে বুক ফেটে যায়।

   শ্রীভগবানের চরণ কমলে মন স্থির হয়ে থাকলে আত্মমগ্ন মন সর্বদা আনন্দরস পান করতে থাকে। সাধারণ মানুষের তা ধারণার বাইরে। প্রেমিকের অন্তরে প্রেমময়ের দিব্য স্ফুর্তি নিরন্তর প্রকট থাকায় আনন্দের অনুভূতি  সর্বদা হয়। কত তীব্র আনন্দের বোধ হলে দেহবোধ সম্পূর্ণ চলে যায়। এই জগতের বিষয়ের প্রতি আমাদের কত আসক্তি। কিন্তু বিষয়ের টান যত তীব্রই হোক, মানুষ নিজের দেহকে ভুলতে পারে না। সংসারে মানুষ ধন সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হলেও আবার জীবন ধারণের আশা করে, পতিহারা সতীও আরামে নিদ্রা যেতে পারে। পুত্রশোকে মাতা পিতা নিদারুণ আঘাত পেলেও আবার আহার গ্রহণ করেন। পুনরায় জীবনের ছন্দে ফিরে আসতে পারেন। অর্থাৎ দেহাত্মবুদ্ধি প্রবল থাকায় দেহের সুখ দুঃখকে অতিক্রম করা সাধারণ জীবের পক্ষে অসম্ভব। পাঠক একবার ভেবে দেখবেন কি, প্রেমময়ের প্রতি কত তীব্র আকর্ষণ থাকলে এবং বাহ্য বস্তুর প্রতি কত গভীর অনাসক্তি থাকলে এমন দেহাত্মবোধ চলে যায়। চৈতন্যদেবের এই সময় আহার নিদ্রা জীবন ধারণের কোন আকাঙ্ক্ষা ছিল না। কেবল ঈশ্বরের ইচ্ছায় ও নিজ স্বভাবের বশে যেন দেহ চলছিল। ভক্তরা খুব সাবধানে তাঁর এই পবিত্র দেহকে সযত্নে রক্ষা করছিলেন।

 একদিন গভীর রাত পর্যন্ত নানা ভগবৎ প্রসঙ্গ করে স্বরূপ নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়েছেন। গোবিন্দ কুঠিয়ার দরজার কাছে শুয়ে রয়েছেন। শেষ রাতে একটা গোঁ গোঁ শব্দ শুনে স্বরূপের ঘুম ভেঙ্গে যায়। গোবিন্দকেও ডেকে তুললেন। কুঠিয়ার ভেতরে গিয়ে দেখেন করুণ দৃশ্য। চৈতন্যদেবের নাক মুখ ক্ষত বিক্ষত, আর  অনর্গল রক্ত ঝরছে।

  স্বরূপ তাড়াতাড়ি ধরে বিছানাতে শুইয়ে দিলেন। কী করে এমন হল ? প্রভু বললেন - এমন প্রবল টান যে ঘরে থাকতে পারছি না। তাড়াতাড়ি বেরোতে গিয়ে দরজা না খুঁজে পেয়ে দেওয়ালের ধাক্কায় এমন ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়ে গেছি।

  স্বরূপ তখন বুঝতে পারলেন যে এ হল দিব্যোন্মাদ অবস্থা। বিন্দুমাত্র দেহের প্রতি খেয়াল নেই। স্বরূপ অন্যান্য ভক্তদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রভুর দেহরক্ষার জন্য আরও সতর্ক হলেন। স্বরূপ দামোদরের ভাই শঙ্করকে চৈতন্যদেব খুব স্নেহ করতেন। তাই রাত্রে কুঠিয়ার ভেতরে শঙ্কর শয়ন করবেন স্থির হল। সকলের অনুরোধে চৈতন্যদেবও তা মেনে নিলেন।

                                             ক্রমশ ...


Comments

  1. AtoAdhyatmic premounmanadoba lekhine modhey prosfutito hoeachhe , Mon khanikta jadi anubhabe samartha hoi , ta hole ei lekhan8 sarthak ! Shradhyajukto pronam naben pujonio Maharaj. 🙏🏻 🙏🏻🙏🏻🙏🏻

    ReplyDelete
    Replies
    1. জয় চৈতণ্য দেবের জয় 🙏
      প্রণাম নেবেন মহারাজ 🙏
      মৌসুমী রায় কোচবিহার।

      Delete
    2. অপুব্ সুন্দর পরিবেশন করেছেন 🙏🏿

      Delete
    3. 🙏🏻🙏🏻🙏🏻

      Delete
  2. অপূর্ব অপূর্ব সুন্দর🙏 যখনই পড়ি মনে হয় এর পর কী হবে? আপনি এটি বই এর আকারে প্রকাশ করুন মহারাজ জী , সবাই পড়তে পারবে ।🙏
    রূপা চক্রবর্তী বিশাখাপত্তনম

    ReplyDelete
    Replies
    1. অপূর্ব সুন্দর লাগলো আবার পড়বো। প্রণাম আচার্য্য দেব । মাধুরী ঘোষাল। নাগের বাজার

      Delete
    2. Pranam Prabhuji, khub sundar Sri Chaitannya Deb er jiban kahini, bhalo laglo.
      Thanks with regards.
      🌹🌹🌹🙏🙏🙏🌹🌹🌹

      Delete
    3. Pronam Maharaj 🙏. Khub bhalo laglo aro jante echhe korchey. Keya Bhattacherjee Cuttack.

      Delete
  3. Pranam Prabhji, Bhaktir Abatar, Sri Chaitannya Mahaprabhu (39), Khub sundar, aro janar apekkhay roilam. 🍀🌻🌹🙏🏻🙏🏻🙏🏻🌹🌻🍀

    ReplyDelete
  4. Jai Mahaprabhu r joy 🌼🙏🙏. Sovakti pranam nibedon kori Mahaprabhu r Shree Padopodmey 🌼🌼🙏🙏. Sovakti pranam Achariyo Maharajji 🌼🌼🙏🙏. Maharajji, Aponer ei 38th porbo er lekhoni paath korey dhonnyo ek holam 🌷🙏. Ki opurbo Vaktivaab Mahaprabhu r. Abhumi naman, Achariyo Maharajji 🌷 🙏

    ReplyDelete
  5. ☝️uporiukto comments Parbati Banerjee, Siliguri thekey 🙏

    ReplyDelete
  6. জয় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জয় 🌷💥🙏 জয় গুরু আচার্যদেব মহারাজজী তব শ্রীচরণ পাদপদ্মে অন্তরের অন্তঃস্থলের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করি 🌷💥🙏
    মহাপ্রভুর জীবনী পড়ে কতো কিছুই অজানা তথ্য জানতে পারছি, শিখতে পাচ্ছি। খুব ভালো লাগছে।জয় ঠাকুর 🌷💥🙏জয় মা 🌷💥🙏জয় স্বামীজি 🌷💥🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. Khub bhalo laglo. Pranam Maharaj. TapasDe Malda

      Delete
    2. Joy mohaprobhu joy. Koob valo laglo.amer pronam neben maharaj.

      Delete
  7. এত অপূর্ব লাগছে তা বলে বোঝানো যাবে না শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা যত শুনছি মন প্রাণ ভরে যাচ্ছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জীবনে এত বিস্তারিতভাবে জানতে পারছি সম্ভব হয়েছে আপনার মতন সাধু সঙ্গের। আপনি আমাদের দেবতা দেবতা বললেও কম হবে। আপনি আমাদের আধ্যাত্মিক পথে নিয়ে যাচ্ছে আপনার শ্রী চরণে সস্তাঙ্গে প্রণাম। শিখা মন্ডল বজবজ।

    ReplyDelete
  8. খুব ভাল লাগছে।অনেক অজানা তথ‍্য জানতে পারছি। প্রণাম মহারাজ🙏🙏ভাল থাকবেন

    ReplyDelete
  9. অপূর্ব লেখা ।কতো কিছু জানতে পারছি মহারাজ আপনার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে । আগামী দিনের অপেক্ষায় রইলাম ।প্রনাম নেবেন মহারাজ ।

    ReplyDelete
  10. Debjani khub valo laglo Pronam Maharaj🙏🙏

    ReplyDelete
  11. Khub bhalo laglo. Aro lakha porle
    Bhalo lage.Pranam Maharaj .
    Pulakesh Sinha Roy. 🙏 🙏

    ReplyDelete
  12. Maharajji...ki sunder bhabe apni likhecgen...mon bhore gelo...
    Pranam mahaprabhu...🙏🙏
    Sradha purno pranam janai...🌹🌺🌹

    ReplyDelete
  13. Khub valo laglo pronam Maharajji

    ReplyDelete
  14. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনকথা খুব ভালো লাগছে। অজানা তথ্য জানতে পারছি। প্রণাম মহারাজ। রীতা নাগ দক্ষিনেশ্বর

    ReplyDelete
  15. 🙏💐💐🙏

    ReplyDelete
  16. Proñam Maharaj Ji,,, Apurba মহাপ্রভুর জীবনী কথা , দারুন দারুন অজানা তথ্য জেনে খুব ভালো লাগছে। খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে , ভগবানের মহিমা নানাভাবে উপকৃত। ধনযবাদান্তে হাজার কোটি কোটি প্রণাম মহারাজ জি,,, Anjali Biswas Naihati,

    ReplyDelete
  17. মহারাজ এটা কি পর্ব 39 না 38 হবে🙏🏻

    ReplyDelete
  18. অনেক গবেষণা করে চৈতন্য দেব সন্মন্ধে আপনি আমাদের এক অমূল্য সম্পদ share করছেন এতেই আমরা ধন্য ।
    প্রনাম মহারাজ 🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  19. 🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙏🏻🙏🏻

    ReplyDelete
  20. মহাপ্রভুর কথা শুনে খুব আনন্দ পাচ্ছি আবার পড়বো কত কথা জানছি প্রনাম জানাই মহারাজের চরণে অঞ্জু শ্রী মুখার্জী বর্ধমান

    ReplyDelete
  21. মহাপ্রভুর জীবনী এতো বিস্তারিত ভাবে জানতে পেরে মন প্রাণ আনন্দে ভরে উঠলো।ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন মহারাজ। বিনম্র শ্রদ্ধাসহ ভক্তিপূর্ন প্রণাম নেবেন। 🙏
    রুবী ভট্টাচার্য ইছাপুর

    ReplyDelete
  22. মহাপ্রভুর কত অজানা তথ‍্য এমন বিস্তারিত ভাবে জানতে পেরে কি আনন্দ হচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করা অসাধ‍্য। মহারাজ জী কে অসংখ্য ধ‍্যনবাদ যে এত কর্ম ব‍্যস্ততার মধ‍্যে ও উনি নিরলশ পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমাদের জন‍্য। প্রণাম জানাই মহারাজ জী কে।

    ReplyDelete
  23. Pronam Maharaj, Bhakti r Avatar Chaitanya Mahaprabhu r Jiboni shombondhe jante pachchi, 38 Parbo pore aaro bhalo laglo. From Anjali Mandal and Family, Bangalore

    ReplyDelete
  24. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তর্দশা অর্দ্ধবাহ্য দশা এই সব ভাবের কথা পড়ে অবাক হয়ে যাচ্ছি। কি মধুর প্রেম আমাদের চিন্তার অতীত! খুব আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। স্বশ্রদ্ধ প্রণাম মহারাজ🌹🌹 অনেক গবেষণা সমৃদ্ধ লেখা।

    ReplyDelete
  25. মহাপ্রভুর অপূর্ব লীলা এতো গভীর ভা বে বর্ণনা করেছেন মহারাজ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ৷ধন্য হলাম প্রভূর লীলা শ্রবন করে ৷ তাঁর কণখমাত্র কৃর্পা ও যদি পাই এই প্রার্থনা ৷🙏🙏

    ReplyDelete
  26. Seema Acharjee Varanasi

    ReplyDelete
  27. ভগবানের জন্য এমন ব্যকুলতা ....আমরা ধন্য গুরুদেব ।এই অমৃত কথা জানতে পাওয়া শুধু আপনার কৃপায়।প্রণাম গুরুদেব 🙏🙏🌷☘️

    ReplyDelete
  28. জয় জয় শ্রী মহাপ্রভুর জয় I আভুমি প্রণাম শ্রী প্রভুর চরণে । প্রণাম মহারাজ জী I রুনা পালিত

    ReplyDelete
  29. Khub bhalo laglo. Pranam Moha Prabhu .

    ReplyDelete
  30. Maharaj aponar sreecharan e antorik bhaktipurno pronam janai. Mahaprovu r leelakotha swapner moto
    Ami Gambhira te gie anekkichu shunechilam ekhon porchi khoob valo lagche.

    ReplyDelete
  31. Sutapa saha kol 52

    ReplyDelete
    Replies
    1. মহারাজের কৃপায় সব কিছুই জানতে পারছি কিন্ত মনে রাখব কি ভাবে প্রণাম নেবেন মহারাজ

      Delete
  32. Shree Chaitanya Dever AntarDasha ArdhobahyaDasha Eto Gavir Valobasa Iswarer proti Ekatma hoye jaoa Iswarer kripa Love kora chara kichu upolobdhi kora somvob na Pronàm Mahaprabhu Pronàm Maharaj DumDum Cantonment REBA Banerjee

    ReplyDelete
  33. "জয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু'র জয়"।🙏❤️🙏।। কী অপূর্ব এই অন্তর্দশা!!!.. অর্ধবাহ্যদশা!!পড়তে পড়তে অন্যজগতে বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম! যদিও অল্প মূহুর্তেই জড়জগৎ এ সম্বিত ফিরে এসেছে; বিষয়াসক্ত থেকে মনতো এখনও উঠে আসেনি কি না..। শ্রদ্ধেয় মহারাজ আমাদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই ও পরম শ্রদ্ধায় আন্তরিক প্রণাম মহারাজ জী 🙏। সুজাতা দে, লন্ডন থেকে।

    ReplyDelete
  34. জয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু। আহা কি অপূর্ব লাগলো পড়ে মন আনন্দে ভরে গেল আচার্য দেব। আমার ভকতি পূর্ন প্রনাম গ্রহন করবেন আচার্য দেব। তৃপ্তি ।

    ReplyDelete

Post a Comment