শংকরাচার্য ।। পর্ব - ৯ ।। স্বামী হরিময়ানন্দ

                          ।।  শংকরাচার্য ।।                                                                                                 ---- স্বামী হরিময়ানন্দ © ধারাবাহিক রচনা "এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্‌ আলয়ং করুণালয়ম্‌। নমামি ভগবদপাদং শংকরম্‌ লোকশংকরম্‌। =============পর্ব-৯============= মণ্ডণ পত্নী উভয় ভারতী দেবী সরস্বতীর সমতুল্য ছিলেন মণ্ডনের পত্নী। যিনি এই   বিতর্ক সভার মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এখন বললেন, হে যতীশ্বর, আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন - এ কথা সত্য। কিন্তু   আমাকে পরাজিত না করলে আপনার পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। আমি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী, কাজেই আপনার অর্ধেক বিজয় হয়েছে, সম্পূর্ণ নয়। আচার্...

ভক্তির অবতার শ্রীচৈতন।। পর্ব-৩৬ ।।

                                         ভক্তির অবতার শ্রীচৈতন্য



                   ©                                                           --- স্বামী হরিময়ানন্দ

ধারাবাহিক রচনা

                  চৈতন্যদেব ভক্তির অবতার; জীবকে ভক্তি শিখাতে এসেছিলেন। - শ্রীরামকৃষ্ণ 


       =========================পর্ব-৩৬===============================

     রায় রামানন্দের সঙ্গে প্রদ্যুম্ন মিশ্রের ভক্তিতত্ত্ব বিষয়ে কী কথা হয়েছিল, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু রায় চৈতন্যমহাপ্রভুকে সাধ্য সাধন তত্ত্ব যা বলেছিলেন তা এখন স্মরণ করতে পারি। পাঠকের আগ্রহ বিবেচনা করে আমরা এখানে তা উল্লেখ করলাম।

ভগবৎ ভক্তির উপায়

১। স্বধর্মাচরণ অর্থাৎ যদি কেউ তার সামাজিক অবস্থান অনুসারে নির্ধারিত দায়িত্ব ভক্তিযুক্ত হয়ে সত্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, তবে ঈশ্বরে ভক্তি তার ভেতরে জাগরিত হবে।

২। ভগবানে কর্ম সমর্পণ এর অর্থ আমরা যা কিছু করি, যা কিছু খাদ্য গ্রহণ করি, যজ্ঞ, দান ইত্যাদি করি সবই ভগবানে সমর্পণ বুদ্ধিতে করতে হবে। একমাত্র ভগবানই সমস্ত সুখ প্রদান করে থাকেন।

৩। স্বধর্ম ত্যাগ এর অর্থ যদি কেউ সমস্ত কর্ম ত্যাগ করে এবং একমাত্র শ্রীভগবানকে অনুসরণ করে তবে তাকে সমস্ত পাপ থেকে ভগবান মুক্ত করে দেন।সে কোন কিছুর জন্য আর শোক করবে না।

৪।জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি এর অর্থ যখন আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ জ্ঞান হয়, তখন মানুষ সম্পূর্ণ ভাবে দুঃখ ও বাসনা থেকে মুক্তি পায় এবং সে মুক্ত হয়ে যায়।

৫। জ্ঞান শূন্য ভক্তি জ্ঞানের কোন সংস্পর্শ ছাড়াই যে ভক্তি তা হল জ্ঞানশূন্য ভক্তি। যেমন ব্রজগোপীরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বয়ং ভগবান রূপে মেনে নেননি। কেউ সখা, কেউ পুত্র, কেউ প্রেমিক রূপে ভগবানকে গ্রহণ করে ছিলেন।

৬। প্রেমভক্তি -  এর অর্থ ভগবান সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্ব জেনে তাঁর প্রতি পরম স্নেহ ভালবাসা প্রদান করা। শর্তহীন সর্বোচ্চ প্রেম হল উচ্চতর অবস্থা।

৭। দাস্য-প্রেম ভগবানের প্রতি দাস্য  ভাব যুক্ত করা। ভগবান হলেন প্রভু আর আমি তাঁর সেবক বা দাস এই ভাব হল দাস্য -প্রেম।

৮। সখ্য -প্রেম ভগবানের সংগে সখা বা বন্ধু ভাবে সংযুক্ত হওয়া।

 

৯। বাৎসল্য -প্রেম ভগবানকে সন্তানভাবে স্নেহ করা।

১০। কান্তভাব-প্রেম ভগবানের সঙ্গে পতিভাবে যুক্ত হওয়া।


      চৈতন্যদেবের স্বভাবই ছিল সব সময় ভক্ত মহাত্মাদের গুণ বর্ণনা করা। সকলের সামনে তাদের প্রশংসা করা। শুধু মৌখিক সম্মান প্রদর্শন নয়, প্রাণপনে চেষ্টা করতেন ও ঐ সব মহাত্মাদের সেবা করতেন। সংসারে লোকে যাকে সুখভোগ বলে সে দিকে তাঁর কোন আকর্ষণ ছিল না। সেই পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তি লাভই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য স্থির রেখে জীবন যাত্রা ভরণপোষণ ইত্যাদি করতেন। তাঁহার সান্নিধ্যে যে সব সাধু, ব্রহ্মচারী, বৈরাগী থাকতেন তাঁদের সুখসুবিধার প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল। সেবকরা বা অন্যান্য ভক্তরা যারা মাঝে মাঝে এসে থাকতেন সকলের প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল।

     জীবনের শেষের দিকে মহাপ্রভু খুবই ভাব-বিহ্বল থাকতেন। রাত্রে কখন কখন ভাবস্থ অবস্থায় বিছানা থেকে উঠেই চলে যেতেন, বাহ্য জ্ঞানের হুশ থাকত না। সে সময় ভক্তরা তাঁদের রক্ষা করতেন। ওই সময় শংকর নামে এক সেবক রাত্রে তাঁর পায়ের কাছে শুয়ে থাকতেন, যাতে রাত্রে উঠলে তিনি বুঝতে পারেন। কোন কোন দিন ঘুম ভাঙ্গলে চৈতন্যদেব দেখতেন শংকর খালি গায়ে শুয়ে রয়েছে। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় শংকরের গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্য দেখেই চৈতন্যদেবের অন্তর স্নেহে আদ্র হত। নিজের গায়ের কাপড় শংকরের গায়ে ঢেকে দিতেন। শংকর প্রেমিক সন্ন্যাসীর ভালোবাসার পরিচয় পেয়ে চোখের জলে ভাসতেন।

একই রকম একটি ঘটনা শ্রীরামকৃষ্ণ অবতারেও ঘটেছিল। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে পড়বে -

    কাশীপুর উদ্যানবাটিতে ঠাকুরের সেবায় ভক্তরা রয়েছেন। বিশেষ করে যারা ভবিষ্যতে ত্যাগ ব্রত গ্রহণ করবেন। একদিন শশী মহারাজ পরবর্তীতে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ শীতের ভোরে গায়ে দেওয়ার তেমন কোন গরম কাপড় নেই। একটা ধুতি পরেছেন ও তার কিছুটা অংশ গায়ে দিয়েছেন। ঠাকুর তখন খুবই অসুস্থ। ঐ অবস্থায় ঠাণ্ডায় শশীকে দেখে তিনি বিছানা থেকে দেওয়ালে ঝোলানো একটা চাদর হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে চাদরের একটা দিক ধরে টানছেন। ঐ সময় সেবক ভাবলেন ঠাকুরের নিশ্চয় ঠাণ্ডা লাগছে, তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল। সেবক হাত জোড়ে বললেন প্রভু , 'অপরাধ নেবেন না,  আমার উচিত ছিল চাদরটি আপনার বিছানায় দেওয়া। তখন ঠাকুর বললেন, ওরে না না, এটা আমার জন্য নয় তোর গায়ে কিছু নেই আর এমন ঠাণ্ডা তাই ওটা তোর গায়ে দেব বলে নিয়ে এলাম। সেবকের দু চোখ জলে ভরে উঠল। তিনি ঐ চাদর কোন দিন ব্যবহার করেন নি। ঠাকুরের চিরন্তন প্রেমের নিদর্শন বলে মাথায় স্পর্শ করে রেখে দিয়েছিলেন।

     প্রধান সেবক গোবিন্দ মহাপ্রভুকে ছায়ার মতো আগলে রাখতেন। কিভাবে প্রভুর একটু আরাম হবে এই ছিল গোবিন্দের ধ্যান জ্ঞান। দুপুরে ভিক্ষাগ্রহণের পর চৈতন্যদেব যখন একটু বিশ্রাম করতেন গা-হাত-পা টিপে দিতেন গোবিন্দ। সর্বদা নৃত্য-সংকীর্তনে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে গোবিন্দ সদা চেষ্টা করতেন প্রভুকে সেবা করতে।

     একদিন এই ভাবে অনেকক্ষণ নৃত্য ও কীর্তন করার ফলে শরীর খুব ক্লান্ত  ছিল। ভিক্ষার পর কুঠিয়াতে গিয়ে দরজার সামনে বসে বিশ্রাম করতে করতে একটু ঘুম এসে যায়। ঐ দরজার সামনে শুয়ে পড়েন। গোবিন্দ একটু পরে এসে ঐ দৃশ্য দেখে চমকে যান। খুব আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে শুতে অনুরোধ করেন। কিন্তু চৈতন্যদেব কোন সাড়া দিলেন না।। অগত্যা গোবিন্দ ঘরের ভেতরে যাওয়ার জন্য পথ দিতে প্রভুকে অনুরোধ করলেন। তাতেও কোন সাড়া পেলেন না। খুবই ক্লান্ত ও অবসন্ন দেখে গোবিন্দ আর কিছু বলতে  বা বিরক্ত করতে সাহস পেলেন না। হাত-পা টিপে দিলে একটু আরাম হত কিন্তু তা করেন কী করে! কুঠিয়ার ভেতরে যাওয়ার উপায় নেই এমন ভাবে দরজার সামনে শুয়ে রয়েছেন। গোবিন্দ কি করবেন বুঝতে না পেরে আর কো্ন উপায় না পেয়ে অগত্যা একটা গামছা চৈতন্যদেবের গায়ে ঢেকে দিলেন। এরপর ডিঙ্গিয়ে ভেতরে গেলেন। খুব ধীরে ধীরে যত্ন সহকারে প্রভুর পায়ের কাছে বসে পদসেবা করতে লাগলেন। একটু পরে চৈতন্যদেব গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়লেন। 

     গোবিন্দের প্রাণ ঠাণ্ডা হল। প্রভুকে ঘুমোতে দেখে একপাশে চুপচাপ বসে থাকলেন। চৈতন্যদেবের ঘুম খুবই কম বরাবরই। একটু পরে জেগে উঠলেন। গোবিন্দকে ওই ভাবে বসে থাকতে দেখে, জানতে চাইলেন তার খাওয়া হয়েছে কিনা। গোবিন্দ মাথা নেড়ে জানালো যে এখনও খাওয়া হয় নি। চৈতন্যদেব খুবই ভাবিত হলেন। এত বেলা পর্যন্ত প্রসাদ না নিয়ে এখানে বসে থাকার কারণ কী। গোবিন্দ প্রথমে চুপ করে ছিলেন। পরে বার বার জিজ্ঞাসা করায় তিনি হাত জোড় করে জানালেন -  দরজায় আপনি শুয়ে আছেন তাই বাইরে যাওয়ার পথ ছিল না। আর না খাওয়ার জন্য কোন কষ্ট হয়নি। চৈতন্যদেব সব শুনে বুঝতে পারলেন ও বললেন যেভাবে ভেতরে এসেছিলে, সে ভাবে গেলে না কেন?। তখন গোবিন্দ যে উত্তর দিয়ে ছিলেন, এটি ভক্তি ও প্রেমের ক্ষেত্রে চিরকালের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রভুর সেবার জন্য প্রভুকে ডিঙ্গিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু নিজের সুখের জন্য প্রভুকে ডিঙ্গিয়ে যাওয়া অপরাধ? গোবিন্দ মুখে কিছু না বললেও তাঁর সেবার ভাব ও নিষ্ঠার পরিচয় পেয়ে চৈতন্যদেব খুবই প্রসন্ন  হলেন।

      কিন্তু এভাবে অনেক বেলা  পর্যন্ত না খেয়ে থাকার জন্য খুবই দুঃখিত হলেন ও ভবিষ্যতে উপবাসে নিজের দেহকে কষ্ট দিয়ে সেবা করতে নিষেধ করলেন। নিজের সেবার জন্য গোবিন্দ গ্রাহ্য করতেন না বরং প্রভুর সেবা করে অত্যন্ত পরিতৃপ্তি লাভ করতেন।

    সেবকদের সুখের প্রতি চৈতন্যদেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। একদিকে নিজে সন্ন্যাস জীবনের কঠোর নিয়ম পালন করতেন আবার অন্যদিকে মানব হৃদয়ের সুকোমল বৃত্তি প্রীতি, স্নেহ, শ্রদ্ধা ভালোবাসা প্রভৃতির বিকাশ তাঁর জীবনকে উচ্চ মহিমা মণ্ডিত করেছিল।

   গর্ভধারিণী, দীক্ষাগুরু, শিক্ষাগুরু, আচার্যগুরু বা স্বামী পরমানন্দ, অদ্বৈতাচার্য ,নিত্যানন্দ বা স্বরূপ দামোদর, রায় রামানন্দ, হরিদাস,সার্বভৌম, শ্রীবাস বা শ্রীরূপ, সনাতন, রঘুনাথ, শঙ্কর বা গোবিন্দ প্রভৃতির প্রতি যথাযোগ্য প্রেমপূর্ণ ব্যবহার আমরা মহাপ্রভুর জীবনে অনেক বার দেখেছি।

   এখন আমরা চৈতন্যদেবের সাধুভক্তি ও সাধুসেবার পরিচয় পাওয়া যায়, এমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করব।

   হরিদাস ঠাকুরের কথা পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে। তিনি পুরীতে থেকে প্রতিদিন তিন লক্ষ জপ করতেন। পুরীতে আসার পর তিনি একদিনের জন্যও কোথাও যাননি। দীর্ঘকাল পুরীতে থেকে চৈতন্যদেবের নির্দেশ মতো সাধন ভজন ও হরিনাম নিয়ে থাকতেন। স্বয়ং চৈতন্যদেব তাঁর কুঠিয়াতে (এখন পুরীতে সিদ্ধ বকুল যে স্থান) রোজ যেতেন ও হরিদাসের ভাল মন্দ খোঁজ খবর নিতেন। মন্দির থেকে  রোজ প্রসাদ সেবককে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। হরিদাসের বয়সও বেশ হয়েছিল। বৃদ্ধ হলেও তিনি নিত্য নিয়মিত জপ ভজন ঠিক সময় মতো করতেন। শেষের দিকে গোবিন্দ এসে দেখতেন হরিদাস শুয়ে শুয়ে হরিনাম করতেন।  একদিন গোবিন্দ প্রসাদ গ্রহণের কথা বললেও তিনি প্রসাদ গ্রহণ করলেন না। প্রসাদ মাথায় স্পর্শ করে গোবিন্দকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন।

    বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও হরিদাস কিছুতেই রাজী হলেন না। শেষে মনের দুঃখে গোবিন্দ ফিরে এসে চৈতন্যদেবকে সব কথা জানালেন। চৈতন্যদেবের মনে বিস্ময়ের সঞ্চার হল। ব্যস্ত হয়ে চৈতন্যদেব কয়েকজন ভক্তসহ হরিদাসের কুঠিয়াতে এলেন। শরীর কেমন আছে ইত্যাদি জানতে চাইলেন। হরিদাস উওরে জানালেন দেহ ভালই আছে, মন -বুদ্ধি ভাল নয়। চৈতন্যদেব হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, মন-বুদ্ধির কি হয়েছে? তখন হরিদাস উওর দিলেন আজ জপের সংখ্যা পূর্ণ হয় নি। চৈতন্যদেব হরিদাসকে অনেক বুঝিয়ে বললেন এখন বয়স হয়েছে, আর শরীর দুর্বল। আগের মতো আর সংখ্যা পূর্ণ করার প্রয়োজন নেই, এই বয়সে  যা পারা যায় তাই যথেষ্ট।

সমাগত ভক্তদের কাছে চৈতন্যদেব হরিদাসের নিষ্ঠা ও ভক্তির খুব প্রশংসা করলেন। হরিদাস খুব সঙ্কোচে করজোড়ে বললেন

"স্বতন্ত্র ঈশ্বর তুমি হও ইচ্ছা ময়।

জগৎ নাচাও তুমি যৈছে ইচ্ছা হয়।

এক বাঞ্ছা হয় মোর বহুদিন হৈতে।

লীলা সম্বরিবে তুমি লয়ে মোরে চিতে।।

সেই লীলা প্রভু মোরে কভু না দেখাইবা।

আপনার আগে মোর শরীর পড়িবা।।

হৃদয়ে ধরিব তোমার কমলচরণ।

নয়নে দেখিব তোমার চাঁদ বদন।।"

   হরিদাসের অন্তরের ভাব বুঝতে পেরে চৈতন্যদেব তাঁকে প্রেমালিঙ্গন দান করলেন।

      পরদিন সকাল বেলা ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে চৈতন্যদেব তাড়াতাড়ি শ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করে হরিদাসের কুঠিয়াতে আসেন। হরিদাসের শরীর আজও ভাল নেই। হরিদাসের ইচ্ছা অনুসারে  তাঁকে মাঝখানে বসিয়ে হরিনাম সংকীর্তন শুরু হল। একে একে বিশিষ্ট ভক্তরাও হাজির হলেন। এলেন স্বরূপ দামোদর, এলেন সার্বভৌম। চৈতন্যদেব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চারদিকে ঘুরে ঘুরে নৃত্য গীত করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ এইভাবে কীর্তনের পর মহাপ্রভু হরিদাসের সামনে বসলেন। হরিদাস এই সুযোগে শ্রীচরণ যুগল বক্ষে ধারণ করলেন। দু চোখের ধারা বেয়ে বুক ভিজে গেল। হরিদাস অপলক দৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে - তাঁর প্রাণের ঠাকুরকে দুচোখ ভরে দেখে নিলেন। শ্রীমুখের প্রতি দৃষ্টি স্থির রেখে,মুখে হরিনাম করতে করতে প্রাণপাখি দেহ খাঁচা থেকে চির বিদায় নিল।

      এ যেন হরিদাসের ইচ্ছা মৃত্যু। সমস্ত ভক্ত উল্লাসে ভগবানের নাম কীর্তন করতে লাগলেন। চৈতন্যদেব ভক্তের ইচ্ছা অনুসারে নিজে হরিদাসের দেহ কোলে নিয়ে নৃত্য আরম্ভ করলেন। পরে কীর্তন করতে করতে পবিত্র দেহ সমুদ্রের তীরে নিয়ে যাওয়া হল। হরিদাসের দেহ সমুদ্রে স্নান করান হল। চৈতন্যদেব বললেন সমুদ্র আজ থেকে মহাতীর্থ হল। পরে পবিত্র দেহ বস্ত্র মালা চন্দনে সাজিয়ে সমুদ্র কিনারে সমাহিত করা হল। চৈতন্যদেব নিজ হাতে এগিয়ে গিয়ে সব কিছু করলেন। পরম ভক্তের শেষ যাত্রা ভগবান স্বয়ং করলেন। এমন ভক্ত হওয়া জগতে অতি দুর্লভ। নিজের হাতে সমাহিত করে সেই স্থানে বালি দিয়ে বেদী তৈরি করে স্থানটি ঘিরে দিলেন। এরপর সকলে সমুদ্রে স্নান করে কীর্তন করতে করতে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে এলেন। আনন্দবাজারে যেখানে মহাপ্রসাদ পাওয়া যায়, চৈতন্যদেব নিজে আঁচল পেতে হরিদাস ঠাকুরের ভাণ্ডারার জন্য মহাপ্রসাদ ভিক্ষা  চাইলেন।

        মহাপ্রভুকে দেখে দোকানদারেরা সমস্ত প্রসাদ আনন্দে দিয়ে দিল। সকলেই প্রসাদ দিতে চায়। অদ্ভুত কাণ্ড! অবশেষে সকলের থেকে কিছু কিছু প্রসাদ নিয়ে সকলকে সন্তুষ্ট করবার চেষ্টা করা হল। চৈতন্যদেব নিজে উপস্থিত হয়ে ভিক্ষা চাওয়াতে সকলের মধ্যে প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। দু বোঝা পরিমাণ প্রসাদ ভিক্ষাতে পাওয়া গেল। রায় রামানন্দের ভাই বাণীনাথ ও কাশী মিশ্র অনেক প্রসাদ পাঠিয়েছিলেন। প্রচুর প্রসাদের আয়োজন হওয়াতে চৈতন্যদেব খুব আনন্দিত হয়েছিলেন। সমস্ত ভক্তদের বসিয়ে প্রসাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। নিজেই পরিবেশন করলেন। প্রচুর প্রসাদ সহকারে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে ভক্তরা প্রসাদ গ্রহণ করলেন। সামনে পৃথক সারিতে অন্যান্য সাধু  সন্ন্যাসীদের নিয়ে মহাপ্রভু প্রসাদ গ্রহণ করলেন।

                                  ক্রমশঃ ----------------

Comments

  1. ভগবৎ ভক্তির উপায় পড়ে মুগ্ধ হলাম। হরিদাস ঠাকুরের দেহ ত্যাগের অপূর্ব কথা জানলাম। আপনার এই লেখাটি জন্য অপেক্ষা করে থাকি। প্রণাম নেবেন মহারাজ। 🌹🌹❤️❤️🙏🙏শুভ্রা লালা। দমদম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. Pronam Maharaj 🙏 kichu e jantam na. Khub bhalo lagche 🙏keya Bhattacherjee Cuttack.

      Delete
    2. খুব ভাল লাগলো।

      Delete
    3. জয় মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য।

      Delete
    4. অসাধারণ। মহাপ্রভুর কি অপূর্ব লীলা 🙏🙏🙏🙏🙏👍

      Delete
    5. জয় চৈতণ্য মহাপ্রভুর জয় 🙏
      ভক্তিপূর্ণ প্রণাম নেবেন মহারাজ 🙏।
      মৌসুমী রায় কোচবিহার।

      Delete
  2. জয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু 🌷💥🙏 জয় গুরু আচার্যদেব মহারাজজী 🌷💥🙏
    অপূর্ব লেখা পড়ে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পাচ্ছি।সাধুভক্তি ও সাধুসেবা পড়ে চোখের ধরে রাখতে পারলাম না।
    গুরু আচার্যদেবের শ্রীচরণ পাদপদ্মে অন্তরের অন্তঃস্থলের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করি 🌷💥🙏 গুরু কৃপাহি কেবলম্ 🙏🌷☘️🌷🙏🙏

    ReplyDelete
  3. 🙏🙏💐🙏🙏

    ReplyDelete
  4. আলো ব্যনার্জী।
    শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী পড়ে চোখে জল এসে গেল, ভগবান ভক্তকে হৃদয়ে ধারণ করেন। খুব ভালো লাগলো মহারাজ🙏 অনেক কিছু জানতে পারি আপনার আশীর্বাদে। আপনার চরণে শ্রদ্ধা ভক্তি পূর্ণ প্রণাম নিবেদন করি মহারাজ🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  5. ভগ বানে কিভাবে ভক্তি হয় এত সুন্দর করে মহারাজ বললেন এটি লিখে রাখব মহাপ্রভুর কথা জানতে পারছি খুব আনন্দ পাচ্ছি প্রণাম নেবেন মহারাজ অঞ্জু শ্রী মুখার্জী বর্ধমান

    ReplyDelete
  6. Apurbo ...joy Mahaprabhu sree chaitanya....anke kichu jante pere khub bhalo laglo...ki bhabe bhakti hoy...ta sunder bhabe barnana korechen...pranam mharajji...🌷🙏🌷
    Jaya choudhury...

    ReplyDelete
  7. প্রণাম শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর | প্রণাম নেবেন মহারাজ জী | খুব ভালো লাগছে এত কিছু জানতে পারছি । রুনা পালিত কেঁচুয়া ডাঙ্গা নদীয়া

    ReplyDelete
  8. HariDas Thakur er Dehatyag Mahaprabhu bujhte perechilen tai Sokol Voktoder nie Hari nam korlen Joy Mahaprabhu Pronàm Mahaprabhu Pronàm Maharaj 🙏🙏 REBA Banerjee Dum Dum Cantonment

    ReplyDelete
  9. শ্রী শ্রী চৈতণ‍্য মহাপ্রভূ সম্বন্ধে অনেক তথ‍্য জানতে পারছি ভাল লাগছে। প্রণাম নেবেন মহারাজ🙏🙏ভাল থাকবেন।মধুমিতা মুখার্জী।দক্ষিনেশ্বর

    ReplyDelete
  10. আহা অপূর্ব! পরম ভক্তি ভগবান আর ভক্তকে এক করে দেয়। এইই তো
    প্রকৃত ভক্তের ভগবান লাভ। অপূর্ব, অপূর্ব ভক্তিকথা যা হয়তো কোনদিনই জানতে পারতাম না, আপনার কৃপায় কত কিছুই যে জানতে পারছি মহারাজ । আমার ভক্তিপূর্ণ সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই আপনার পাদপদ্মে মহারাজ 🙏🙏🙏
    সুমিত্রা সরকার, লেকটাউন ।

    ReplyDelete
  11. অপূর্ব
    প্রণাম মহারাজ

    ReplyDelete
  12. অপূর্ব , খুব সুন্দর, প্রনাম মহারাজ 🙏🙏

    ReplyDelete
  13. Mahaprabhu r Shree Padopodmey sovakti pranam nibedon kori 🌼🙏. Sovakti pranam, Achariyo Maharajji 🌼🙏. Maharajji, Ashlee 36th porbo er lekhoni porey khubei mugdho holam 🙏. Aaj , Vagabat Vakti r upay somuho Jantey perey otibo dhonnyo 🌷🙏. Ki opurbo Vagabat Prem Swang Gobindo o Haridas er🙏🙏. Amar 'Premovakti' khubei valo lagey 🙏. Osadharon aajker uposthapona 🌷🙏. Sotokoti Abhumi Naman, Achariyo Maharajji 🌷🌷🌼🌼🙏🙏.

    ReplyDelete
  14. 👆Achariyo Maharajji, uporiukto montobyo Parbati Banerjee r, Siliguri thekey 🌻🌻🙏🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভীষন ভালো লাগলো মন ছুঁয়ে গেল প্রণাম।
      মাধুরী ঘোষাল নাগের বাজার।

      Delete
  15. খুবই উপভোগ্য উপস্থাপনায় আপ্লুত হলাম,,,,,,,, মদনমোহন বেজ। ব্যান্ডেল।

    ReplyDelete
  16. স্বধর্মাচারণ আর স্বধর্ম ত্যাগ এই দুটোই কি সব স্তরের ভক্তের জন্য ? না কি অধিকার ভেদের উপর নির্ভরশীল।

    খুব ভালো লাগছে, পড়তে।
    সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্ৰহণ করুন।

    ReplyDelete
  17. অপূর্ব লেখাটি পড়ে খুবই ভালো লাগলো।ভগবৎ ভক্তির উপায় টি বিশদভাবে জানলাম। আপনার সান্নিধ্যে এসে প্রতিনিয়ত জ্ঞানের ভান্ডার পূর্ন করে চলেছি।
    সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন 🙏
    রুবী ভট্টাচার্য ইছাপুর

    ReplyDelete
  18. অপূর্ব উপস্থাপনা। অনেক কিছু জানতে পেরে ধন্য মনে কোরলাম নিজেকে

    ReplyDelete
  19. খুব ভালো লাগলো ভক্ত শ্রী হরিদাসের কাহিনী🙏🙏🙏
    সুমিতা চক্রবর্তী, রামপুরহাট

    ReplyDelete
  20. খুব ভালো লাগলো ভক্ত হরিদাসের কাহিনী জেনে ।অপূর্ব উপস্থাপনা । আগামী লেখার অপেক্ষায় রইলাম । ভালো থাকবেন ।আপনি আমার সশ্রদ্ধ প্রনাম নেবেন ।
    লিলি সাহা ।দমদম ।

    ReplyDelete
  21. খুব ভালো লাগছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা এত বিস্তারিতভাবে জানতে পারছি আপনার সান্নিধ্যে এসেছি বলে। আপনার সান্নিধ্যে এসে আমরা নিজেকে ধন্য মনে করি প্রণাম শিক্ষাগুরুদের শিখা মন্ডল বজবজ।

    ReplyDelete
  22. Khub bhalo laglo. Darun! Khub Ananda hochhe.Pranam Maharaj 🙏🙏 Pulakesh Sinha Roy.

    ReplyDelete
  23. প্রণাম মহারাজ জী 🙏 অপূর্ব উপস্থাপনা , পড়তে পড়তে চোখে জল এসে যায়। কিছুই জানতাম না এখন কতকিছুই শিখছি পড়ছি । আপনি ভালো থাকুন এই কামনা করি🙏
    রূপা চক্রবর্তী বিশাখাপত্তনম

    ReplyDelete
  24. শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু সম্পর্কে মহারাজজী‘র প্রতিটি লিখাই পড়ে খুব অভিভূত হই! অপূর্ব প্রত্যকটি ঘটনা! এমন চমৎকার করে ব্যাখ্যা করে লিখেন শ্রদ্ধেয় মহারাজ; সত্যিই পড়তে পড়তে চোখে জল চলে আসে! যেমন- শংকরের গায়ে তাঁর নিজের গায়ের কাপড় দেয়া, মহাপ্রভুর প্রতি গোবিন্দের অত্যন্ত ভক্তি প্রেমের ভালবাসা, হরিদাসের জপের সংখ্যা পূর্ণ করার যে প্রবল নিষ্ঠা ভক্তি। প্রতিনিয়তই অজানাকে জানছি, জ্ঞাত হওয়ার পাশাপাশি শিখছিও অনেক বিষয়। সাধ্য সাধন তত্ত্ব তথা ভগবৎ ভক্তির উপায়গুলো জেনে বেশ সমৃদ্ধ হলাম উপকৃতও হচ্ছি। মনে রেখে সেভাবে নিজেকে তৈরীতে সহায়ক হবে।
    সুজাতা রানী দে। লন্ডন,ইউ.কে।

    ReplyDelete
  25. শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু'র শ্রী চরণে অন্তরের পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তি পূর্ণ প্রণাম করি ষষ্ঠাঙ্গে🙏। তাঁর পরমেশ্বরের প্রতি অগাধ ভক্তি, সন্যাস জীবনে কঠোর নিয়ম পালনে সদা সচেষ্ট থাকা এবং অন্যের প্রতি স্নেহ, প্রীতি, শ্রদ্ধা ভালবাসায় পূর্ণ ছিল মহাপ্রভু'র অন্তর। গর্ভধারিণী থেকে শুরু করে সকল সাধু- মহাত্মাগণ, ভক্ত, সেবক প্রত্যেকের প্রতি তাঁর প্রেমপূর্ণ ব্যবহার জেনে বেশ মুগ্ধ হই! জয় শ্রদ্ধেয় গুরু মহারাজ জী, পরম শ্রদ্ধায় অন্তহীন প্রণাম জানাই 🙏। জয় দিব্যত্রয়ী'র জয় 🙏🙏🙏।
    সুজাতা রানী দে।
    লন্ডন, ইউ.কে।

    ReplyDelete
  26. খুব সুন্দর মনোশান্তিওঐশ্বর্য্যময় হয়ে ।জয় মহাপ্রভু চৈতন্যদেব।

    ReplyDelete
  27. জয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জয়।সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই মহারাজ।মহাপ্রভুর ব্লগ অত্যন্ত্ আকর্ষণীয়, যত পড়ছি তত আগ্রহ বাড়ছে।আবার অপেক্ষায় রইলাম মহারাজ।

    ReplyDelete
  28. Pronam Maharaj....aMaha Provur kotha porte porte mone hoche okhanei powchegechi.....opurbo....🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼...Supriya Saha, clubtown paradise.

    ReplyDelete
  29. Maharaj Ji upner ei uposthaponay amar khub valo laglo.
    Apurbo Haridaser ei vaktiprem sune dhonnoyo hoye gelam.

    ReplyDelete
  30. Apurbo Haridaser ei Vaktiprem jante pere njijeke dhpnyo mone korlam
    .Achyaryo Deb upner ei uposthaponay ami jarponai anondito o nejeke dhonyo mone korchi. Upni amar kotikoti vulunthito pronam grohan korben.


    ReplyDelete
  31. 🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼

    ReplyDelete
  32. 🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏

    ReplyDelete

Post a Comment