শ্রীমদ্ভাগবত ১ম স্কন্ধ ।। পঞ্চম
অধ্যায়।।
অনুবাদ - স্বামী হরিময়ানন্দ
সূত
উবাচ
অথ তং সুখমাসীন উপাসীনং
বৃহচ্ছ্রবাঃ।
দেবর্ষিঃ প্রাহ বিপ্রর্ষিং
বীণাপাণিঃ স্ময়ন্নিব।।১
সরলার্থ – সূত ঋষি
বললেন – তখন দেবর্ষি নারদ সুখে উপবিষ্ট হয়ে স্মিত হেসে বিপ্রর্ষি বেদব্যাসকে বললেন।
নারদ উবাচ
পারাশর্য মহাভাগ ভবতঃ
কচ্চিদাত্মনা।
পরিতুষ্যতি শারীর আত্মা
মানস এব বা ।।২
সরলার্থ – পরাশর পুত্র
ব্যাসদেবকে সম্মোধন করে দেবর্ষি নারদ জিজ্ঞাসা করলেন – তুমি কি
তোমার দেহ অথবা মনকে তোমার স্বরূপ বলে মনে করে সন্তুষ্ট হয়েছ?
জিজ্ঞাসিতং সুসম্পন্নমপি
তে মহদদ্ভুতম্।
কৃতবান্ ভারতং যস্ত্বং
সর্বার্থপরিবৃঙ্ঘিতম্।।৩
সরলার্থ – আপনার মনের
জিজ্ঞাসা তো অবশ্যই পূর্ণ হয়েছে, কারণ আপনি যে মহাভারত গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন সে তো
এক আপরূপ রচনা। কারণ তাতে ধর্ম ইত্যাদি পূর্ণরূপে আলোচিত হয়েছে।
জিজ্ঞাসিতমধীতং চ ব্রহ্মযত্তৎ
সনাতনম্।
তথাপি শোচস্যাত্মানমকৃতার্থ
ইব প্রভো।।৪
সরলার্থ – সনাতন ব্রহ্মতত্ত্বেরও
আপনি সূক্ষ্ম বিচার করেছেন ও বুঝেছেন। তবুও হে মহাত্মন্ ! আপনি অকৃতকার্য ব্যক্তির
মতো নিজের সম্পর্কে কেন অনুশোচনা করছেন?
ব্যাস উবাচ
অস্ত্যেব মে সর্বমিদং
ত্বয়োক্তং তথাপি নাত্মা পরিতুষ্যতে মে।
তন্মূলম্ব্যক্তমগাধবোধং
পৃচ্ছামহে ত্বাত্মভবাত্মভূতম্ ।। ৫
সরলার্থ – ব্যাসদেব
বললেন – আপনি আমার সম্বন্ধে যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ
সত্য, কিন্তু এ সমস্ত সত্ত্বেও আমার হৃদয় সন্তুষ্ট হচ্ছে না। তাই আমি আপনাকে আমার অসন্তোষের
মূল কারণ জিজ্ঞাসা করছি, কে না স্বয়ম্ভূব ব্রহ্মার সন্তান আপনি অসীম জ্ঞানের অধিকারী।
স বৈ ভবান্ বেদ সমস্তগুহ্যমুপাসিতো
যৎপুরুষঃ পুরাণঃ।
প্রাবরেশো মনসৈব বিশ্বং
সৃজত্যবত্যত্তি গুণৈরসঙ্গঃ ।। ৬
সরলার্থ – হে দেবর্ষি!
আপনি সব শাস্ত্রের গুহ্য রহস্য অবশ্যই অবগত আছেন, কারণ আপনি সেই পুরাণপুরুষের উপাসনা
করেছেন, যিনি প্রকৃতি ও পুরুষ – উভয়েরই প্রভু এবং নির্লিপ্ত
থেকেও নিজ সংকল্প মাত্রই ত্রিগুণের দ্বারা এই জগৎ সৃজন, পালন ও সং হার করে থাকেন।
ত্বং পর্যটন্নর্ক ইব
ত্রিলোকীমন্তশ্চরো বায়ুরিবাত্মসাক্ষী।
পরাবরে ব্রহ্মণি ধর্মতো
ব্রতৈঃ স্নাতস্য মে ন্যূনমলং বিচক্ষ্ব।।৭
সরলার্থ – আপনি সূর্যের
মতো ত্রিভুবন পরিভ্রমণ করেন এবং আপনি যোগবলে প্রাণবায়ুর মতো সকলের অন্তরে প্রবিষ্ট
থেকে অন্তঃকরণের ভাবটি পর্যন্ত দেখতে সমর্থ ও সাক্ষী স্বরূপ। যোগানুষ্ঠান এবং নিয়মপালন
দ্বারা পরব্রহ্ম ও শব্দব্রহ্ম দুটিতেই অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও আমার মধ্যে যে অপূর্ণতা
রয়েছে তার কারণ আপনি বলুন।
শ্রীনারদ উবাচ
ভবতানুদিতপ্রায়ং যশো
ভগবতো৳মলম্।
যেনৈবাসৌ ন তুষ্যেত
মন্যে তদ্দর্শনং খিলম্।।৮
সরলার্থ – নারদ বললেন
– হে বেদব্যাস! ভগবানের নির্মল যশঃকীর্তন, ভগবৎ
মহিমা বর্ণন আপনার দ্বারা প্রায় অনুক্তই রয়ে গেছে। আমার মনে হয় ভগবান যাতে প্রীতিওলাভ
করেন না, সেই শাস্ত্র বা জ্ঞান ব্যর্থ।
যথা ধর্মাদয়শ্চার্থা
মুনিবর্যানুকীর্তিতাঃ।
ন তথা বাসুদেবস্য মহিমা
হ্যনুবর্ণিতঃ।। ৯
সরলার্থ – আপনি যেভাবে
ধর্ম ও চার পুরুষার্থের কীর্তন করেছেন, তেমন ভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করেন নি।
ন যদ্বচশ্চিত্রপদং হরের্যশো
জগৎপবিত্রং প্রগৃণীত কর্হিচিৎ।
তদ্বায়সং তীর্থমুশন্তি
মানসা ন যত্র হংসা নিরমন্ত্যুশিক্ষয়াঃ।।১০
সরলার্থ – যে বাক্য
তা যতই রস ভাব ও অলংকার যুক্ত হোক না কেন – জগৎপাবন
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের যশকীর্তন না করে, সে বাক্য কাকের জন্য উচ্ছিষ্ট ফেলার স্থান বা আস্তাকুড়ের
মতোই অপবিত্র।
তদ্বাগ্বিসর্গো জনতাঘবিপ্লবো
যস্মিন্ প্রতিশ্লোকমবদ্ধত্যপি।
নামান্যনন্তস্য যশো৳ঙ্কিতানি
যৎ
শৃণ্বন্তি গায়ন্তি গৃণন্তি
সাধবঃ।।১১
সরলার্থ – অপরপক্ষে
সুন্দর রচনা শৈলী নেই, অপভাষায় রচিত কিন্তু
যে রচনার প্রত্যেক শ্লোক ভগবানের পবিত্র গুণাবলীযুক্ত, সেই বাক্য লোকের সমস্ত পাপ নাশ
করে দেয় কারণ মহাপুরুষগণ এই রকম বাণী শ্রবণ বর্ণন ও কীর্তোন করে থাকেন।
নৈষ্কর্ম্যমপ্যচ্যুতভাববুর্জিতং
ন শোভতে জ্ঞানমলং নিরঞ্জনম্।
কুতঃ পুনঃ শশ্বদভদ্রমীশ্বরে
না চার্পিতং কর্ম যদপ্যকারণম্।।১২
সরলার্থ – মোক্ষলাভের
নিশ্চিত সাধন সেই নির্মল জ্ঞানও যদি ভগবদ্ভক্তিশূন্য হয়, তাহলে তা শোভা পায় না। সুতরাং
যে সাধন এবং যে সিদ্ধি – দুই অবস্থাতেও সর্বদাই
অমঙ্গলরূপ হয়,সেই সকাম কর্ম ও ভগবানে অর্পিত হয়নি এরকম নিষ্কাম কর্ম কীকরে সুশোভিত
হতে পারে।
অথো মহাভাগ ভবানমোঘদৃক্
শুচিশ্রবাঃ সত্যরতো ধৃতব্রতঃ।
উরুক্রমস্যাখিল্বন্ধমুক্তয়ে
সমাধিনানুস্মর তদ্বিচেষ্টিতম্।।১৩
সরলার্থ - হে মহাভাগ ব্যাসদেব, আপনি অব্যর্থদৃষ্টি সম্পন্ন
, পবিত্রকীর্তি , সত্য-পরায়ণ ও দৃঢ়ব্রত। সুতরাং জীবের বন্ধন মুক্তির জন্য সমাধি যোগের
দ্বারা অচিন্ত্যশক্তি ভগবানের লীলাসকল ধ্যান করুন।
ততো৳ন্যথা কিঞ্চন যদ্বিবক্ষতঃ
পৃথগ্দৃশস্তৎকৃতরূপনামভিঃ।
ন কর্হিচিৎক্বাপি চ
দুঃস্থিতা মতির্লভেত বাতাহতনৌরিবাস্পদম্।।১৪
সরলার্থ - যে ব্যক্তি শ্রীভগবানের লীলা ছাড়া অন্য কিছু বলতে ইচ্ছা করে সে স্ব-ইচ্ছায় নির্মিত নাম-রূপের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তার বুদ্ধি ভেদাভেদ জ্ঞানে আচ্ছন্ন হয়। যেমন ঝড়-জলে পড়লে নৌকা চঞ্চল, বেহাল হয়, সে রকম তার মনও স্থির হতে পারে না।
জুগুপ্সিতং ধর্মকৃতে৳নুশাসতঃ
স্বভাবরক্তস্য মহান্ ব্যতিক্রমঃ।
যদ্বাক্যতো ধর্ম ইতীতরঃ
স্থিতো ন মন্যতে তস্য নিবারণং জনঃ।।১৫
সরলার্থ – সংসারী
মানুষ স্বভাবতই বিষয়-বিষে আক্রান্ত। ধর্মসাধনের উদ্দেশ্যে আপনি তাদের নিন্দনীয় পশুহিংসা
যুক্ত কাম্য কর্মেরও উপদেশ দিয়েছেন। এটা হিতে বিপরীত হয়েছে। কারণ অজ্ঞ মানুষ আপনার
অনুশাসন গ্রহণ করে পূর্বোক্ত নিন্দিত কর্মকেই ধর্ম বলে মনে করে এই কর্ম অনুষ্ঠানকেই
মুখ্য ধর্ম এইভাবে দৃঢ় নিশ্চয় হয়ে সেই কাম্য কর্মের নিষধকে গ্রাহ্য করে না।
বিচক্ষণো৳স্যার্হতি
বেদিতুং বিভোরনন্তপারস্য নিবৃত্তিতঃ সুখম্।
প্রবর্তমানস্য গুণৈরনাত্মনস্ততো
ভবান্দর্শয় চেষ্টিতং বিভোঃ।।১৬
সরলার্থ- ভগবান অনন্ত।
বিবেকী পুরুষই নিবৃত্তি মার্গ অবলম্বন করে শ্রীভগবানের সেবাসুখ আস্বাদনে সমর্থ হয়।
সুতরাং যারা জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ও তিন গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সংসার চক্রে আবদ্ধ,
তাদের মঙ্গলের জন্য শ্রীভগবানের লীলাকথা সর্বসাধারণের জন্য বর্ণনা করুন।
ত্যক্ত্বা স্বধর্মং
চরণাম্বুজং হরে-
র্ভজন্নপক্বো৳থ পতেত্ততো
যদি।
যত্র ক্ব বাভদ্রমভূদমুষ্য
কিং
কো বার্থ আপ্তো৳ভজতাং
স্বধর্মতঃ।। ১৭
সরলার্থ - যে ব্যক্তি স্বধর্ম পরিত্যাগ করে শ্রীহরির চরণ কমল
ভজনা করেন, যদি সিদ্ধিলাভের পূর্বে ভজন ত্যাগ করেন তাহলেও তার কী অকল্যাণ হতে পারে?
আবার যারা গোবিন্দ ভজন না করে কেবল স্বধর্মই পালন করেন তাদেরই বা কী ফল লাভ হয়?
তস্যৈব হেতোঃ প্রয়তেত
কোবিদো
ন লভ্যতে যদ্ভ্রমতামুপর্যধঃ।
তল্লভ্যতে দুঃখবদন্যতঃ
সুখং
কালেন সর্বত্র গভীররঙ্ঘসা।।১৮
সরলার্থ – কর্মহেতু
তৃণ থেকে ব্রহ্মা পর্যন্ত সকল যোনিতে গমনাগমনের দ্বারাও যাকে পাওয়া যায় না, সেই বস্তুকে
লাভ করার জন্যই বুদ্ধিমান ব্যক্তির প্রযত্নশীল
হওয়া উচিত। দুঃখ যেমন পূর্ব জন্মের কর্ম বশত
আপনিই আসে, সাংসারিক বিষয়সুখও তেমনিই অচিন্ত্যগতি কালের প্রভাবে বিনা চেষ্টাতেই আপনিই
আসে।
ন বৈ জনো জাতু কথঞ্চনাব্রজে-
ন্মুকুন্দসেব্যন্যবদঙ্গ
সংসৃতিম্।
স্মরন্মুকুন্দাঙ্ঘ্রুপগূহনং
পুন-
র্বিহাতুমিচ্ছেন্ন রসগ্রহো
জনঃ।।১৯
সরলার্থ – হে ব্যাসদেব,
শ্রীগোবিন্দচরণ সেবন পরায়ণ ব্যক্তি যদি ভগবৎভজনহীন ব্যক্তির মতো দৈবাৎ কোন দুরভিনিবেশ
যুক্ত হয়ে পড়েন, তবুও কখনও জন্মমৃত্যুময় সংসারে আর ফিরে আসেন না। তাঁরা ভগবানের পাদপদ্ম
আলিঙ্গন স্মরণ করে আর সেই স্মরণ ত্যাগ করতে চান না, কারণ তাঁরা অমৃতরসের রসিক হয়ে যান।
ইদং হি বিশ্বং ভগবানিবেতরো
যতো জগৎস্থাননিরোধসম্ভবাঃ।
তদ্ধি স্বয়ং বেদ ভবাংস্তথাপি
তে
প্রাদেশমাত্রং ভবতঃ
প্রদর্শিতম্।।২০
সরলার্থ – যাঁর থেকে
সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয় হয় সেই ঈশ্বরই এই বিশ্বের রূপেও বর্তমান। এ সত্ত্বেও তিনি কিছুতেই
সম্পর্কিত নন। এ কথা আপনি জানেন, তবুও আপনাকে সামান্য দিগ্দর্শন করালাম।
ত্বমাত্মনাত্মানমবেহ্যমোঘদৃক্
পরস্য পুংসঃ পরমাত্মনঃ
কলাম্।
অজং প্রজাতং জগতঃ শিবায়
ত-
ন্মহানুভাবাভ্যুদয়ো৳ধিগণ্যতাম্।।
২১
সরলার্থ – হে পরাশরনন্দন!
আপনি অভ্রান্তদ্রষ্টা, আপনি নিজেই পরমপুরুষ শ্রীভগবানের কলাবতার। জন্মরহিত হয়েও জগৎ
কল্যাণের জন্য আপনি দেহ ধারণ করেছেন। সুতরাং আপনি শ্রীহরির লীলাসকল বিস্তারিতভাবে কীর্তন
করুন।
ইদং হি পুংসস্তপসঃ শ্রুতস্য বা
স্বিষ্টস্য সূক্তস্য
চ বুদ্ধিদত্তয়োঃ।
অবিচ্যতো৳র্থঃ কবিভির্নিরূপিতো
যদুত্তমশ্লোকগুণানুবর্ণ্নম্।।
২২
সরলার্থ – পণ্ডিতেরা
বলেন যে শ্রীগোবিন্দগুণ ও লীলা বর্ণনই জীবের
তপস্যা, বেদ অধ্যয়ন, যজ্ঞানুষ্ঠান, স্বাধ্যায় জ্ঞান ও দানের একমাত্র উদ্দেশ্য।
অহং পুরাতীতভবে৳ভবং
মুনে
দাস্যাস্তু কস্যাশ্চন
বেদবাদিনাম্।
নিরূপিতো বালক এব যোগিনাং
শুশ্রূষণে প্রাবৃষি
নির্বিবিক্ষতাম্ ।।২৩
হে মুনিবর, পূর্বকল্পে আমি বেদজ্ঞ ঋষিদেরপরিচর্যা রত এক দাসীর
পুত্ররূপে জন্মগ্রহন করেছিলাম। বর্ষাকালের চার মাস তাঁরা যখন একত্রে বসবাস করছিলেন,
তখন আমি তাঁদের সেবায় নিযুক্ত ছিলাম।
তে ময়্যপেতাখিলচাপলে৳র্ভকে
দান্তে৳ধৃতক্রীড়নকে৳নুবর্তিনি।
চক্রুঃ কৃপাং যদ্যপি
তুল্যদর্শনাঃ
শুশ্রূষমাণে মুনয়ো৳ল্পভাষিণি।।২৪
সরলার্থ – যদিও তাঁরা
ছিলেন সমদর্শী, সেই বেদজ্ঞ মুনিরা তাঁদের অহৈতুকী করুণার প্রভাবে আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন।
যদিও আমি তখন এক বালক মাত্র ছিলাম, কিন্তু তবুও আমি ছিলাম সংযত ও সব রকম খেলাধূলার
প্রতি উদাসীন। আছাড়া আমি দুরন্ত ছিলান না এবং আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলতাম না।
উচ্ছিষ্টলেপাননুমোদিতো
দ্বিজৈঃ
সকৃৎস্ম ভুঞ্জে তদপাস্তকিল্বিষঃ
এবং প্রবৃত্তস্য বিশুদ্ধচেতস-
স্তদ্ধর্ম এবাত্মরুচিঃ
প্রজায়তে।।২৫
সরলার্থ – একবার কেবল
অনুমতি নিয়ে আমি তাঁদের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ গ্রহণ করেছিলাম। সেই প্রসাদের গুণে আমার সমস্ত
পাপ ধুয়ে মুছে গেল। এই ভাবে তাঁদের সেবা করতে করতে আমার চিত্তশুদ্ধ হল ও তাঁরা যেমন
ভজন পূজন করত আমারও তাতে রুচি জন্মায়।
তত্রান্বয়ং কৃষ্ণকথাঃ
প্রগায়তা
মনুগ্রহেণাশৃণবং মনোহরাঃ।
তাঃ শ্রদ্ধয়া মে৳নুপদং
বিশৃণ্বতঃ
প্রিয়শ্রবস্যঙ্গ মমাভবদ্রুচিঃ।।
২৬
সরলার্থ – হে ব্যাসদেব,
সেখানে ঋষিরা প্রতিদিন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাজের বর্ণনা করতেন। তাঁদের অনুগ্রহে
তা আমি শুনতাম। এই ভাবে এক মনে তা শোনার ফলে প্রতিপদে পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা শোনার
রুচি বৃদ্ধি পায়।
তস্মিংস্তদা লব্ধরুচের্মহামতে
প্রিয়শ্রবস্যস্খলিতা
মতির্মম।
যয়াহমেতৎসদসৎস্বমায়য়া
পশ্যে ময়ি ব্রহ্মণি
কল্পিতং পরে।। ২৭
সরলার্থ – হে মহর্ষি,
পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি রুচি লাভ করা মাত্রই ভগবানের মহিমা আমি স্থির বুদ্ধি হয়েছিলাম।
সেই রুচি যত বাড়তে থাকে, ততই আমি বুঝতে পারি যে আমার অজ্ঞানতার ফলে আমাকে এই স্থূল
ও সূক্ষ্ম শরীর গ্রহণ করতে হয়েছে, কেন না ভগবান ও জীব উভয়েই প্রপঞ্চাতীত।
ইত্থং শরৎপ্রাবৃষিকাবৃতু
হরে-
র্বিশৃণ্বতো মে৳নুসবংযশো৳মলম্।
সংকীর্ত্যমানং মুনিভির্মহাত্মভি-
ভক্তিঃ প্রবৃত্তাত্মরজস্তমোপহা।।
২৮
সরলার্থ – এই ভাবে
বর্ষা ও শরৎ - দুটি ঋতুতে সেই মহান ঋষিদের দ্বরা কীর্তিত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির কীর্তন
শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ভগবানের প্রতি ভক্তির ভাব যখ আমার মনে প্রবাহিত হতে শুরু
করল, তখহ্ন রজ ও তমোগুণের আবরণ দূর হয়ে গেল।
তস্যৈবং মে৳নুরক্তস্য
প্রশ্রিতস্য হতৈনসঃ।
শ্রদ্দধানস্য বালস্য
দান্তস্যানুচরস্য চ।। ২৯
সরলার্থ – আমি সেই
ঋষিদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়েছিলাম। আমার ব্যবহার ছিল নম্র এবং তাঁদের সেবা করার
ফলে আমার সমস্ত পাপ মোচন হয়েছিল। আমার হৃদয়ে তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ছিল। আমি আমার
সমস্ত ইন্দ্রিয় গুলিকে সংযত করেছিলাম এবং আমার দেহ ও মনের দ্বারা আমি অবিচলিত ভাবে
তাঁদের আজ্ঞা পালন করেছিলাম। ২৯
জ্ঞানং গুহ্যতমং যত্তৎসাক্ষাদ্ভগবতোদিতম্।
অন্ববোচন্ গমিষয়ন্তঃ
কৃপয়া দীনবৎসলাঃ।।
সরলার্থ – দীনবৎসল
সেই ঋষিরা যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁরা স্বয়ং ঈশ্বর প্রদত্ত পরম জ্ঞান আমাকে দান করেছিলেন।৩০
যেনৈবাহং ভগবতো বাসুদেবস্য
বেধসঃ।
মায়ানুভাবমবিদং যেন
গচ্ছন্তি তৎপদম্।।
সরলার্থ – সেই জ্ঞানের
প্রভাবে আমি সব কিছুর সৃষ্টি কর্তা, পালনকর্তা ও ধ্বংসকর্তা পরমেশ্বর ভগবানের শক্তির
প্রভাব স্পষ্টভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলাম। তা জানার ফলে সহজেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া
যায় এবং তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করা যায়।৩১
এতৎসংসূচিতং ব্রহ্মংস্তাপত্রয়চিকিৎসিতম্।
যদীশ্বরে ভগবতি কর্ম
ব্রহ্মণি ভাবিতম্।।৩২
সরলার্থ – হে ব্রাহ্মণ,
শাস্ত্রজ্ঞরা বলে গেছেন যে ত্রিতাপ দুঃখ নিরাময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে পরমেশ্বর
ভগবানের উদ্দেশ্যে সমস্ত কর্ম সমর্পণ করা।৩২
আময়ো যশ্চ হ্যাময়ং দ্রব্যং
ন পুন্যতি চিকিৎসিতম্।।৩৩
সরলার্থ – হে ব্যাসদেব,
যে সব খাদ্যবস্তু গ্রহণে জীবের রোগসৃষ্টি হয়, সে সব দ্রব্য রোগকে দূরীভূত করে না বটে,
কিন্তু ঘৃতাদি অনুপান দ্রব্য সংযোগে রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে।৩৩
এবং নৃণাং ক্রিয়াযোগাঃ
সর্বে সংসৃতিহেতবঃ।
ত এবাত্মবিনাশায় কল্পতে
কল্পিতাঃ পরে।।৩৪
সরলার্থ – এই ভাবে
লৌকিক ও শাস্ত্র সম্মত যে সব কাম্যকর্মসমূহ জীবের সংসার বন্ধনের কারণ হয়, সে গুলি আবার
শ্রীভগবানে সমর্পিত হলে কর্তৃত্ববুদ্ধি বা অহং-বুদ্ধির বিনাশ ঘটে। ৩৪
যদত্র ক্রিয়তে কর্ম
ভগবৎপরিতোষণম্ ।
জ্ঞানং যত্তদধীনং হি
ভক্তিযোগসমন্বিতুম্।। ৩৫
সরলার্থ – ভগবানের
সন্তুষ্টির জন্য এই সংসারে যে সব কর্ম অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, শ্রবণ-কীর্তনাদি-রূপ সেই
সব কর্মের দ্বারা যে ভগবদ্জ্ঞান হয়, তা অবশ্যই ভক্তিযোগযুক্ত হয়ে থাকে।
কুর্বাণা যত্র কর্মাণি
ভগবচ্ছিক্ষয়াসকৃৎ।
গৃণন্তি গুণানামানি
কৃষ্ণস্যানুস্মরন্তি চ।।৩৬
সরলার্থ -মানব যখন ভগবানের
নির্দেশ অনুসারে কর্ম করে তখন সেই কর্মের সঙ্গে সঙ্গে তারা ভগবানের নামগুণ কীর্তন করেন এবং তাঁকে স্মরণ
করেন। ৩৬
ও নমো ভগবতে তুভ্যং
বাসুদেবায় ধীমহি।
প্রদ্যুম্নায়ানিরুদ্ধায়
নমঃ সঙ্কর্ষণায় চ।।৩৭
সরলার্থ – প্রণবস্বরূপ
হে শ্রীকৃষ্ণ, আপনি বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধ – এই চার
মূর্তি। আপনাকে মনের দ্বারা নমস্কার ও ধ্যান করি।
ইতি মূর্ত্যভিধানেন
মন্ত্রমূর্তিমমূর্তিকম্।
যজতে যজ্ঞপুরুষং স সম্যগ্
দর্শনঃ পুমান্।।৩৮
সরলার্থ – এইভাবে
যিনি বাসুদেবাদি চার মূর্তির নামযুক্ত মন্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ মন্ত্রাত্মক মূর্তিকে
ও মূর্তিহীন যজ্ঞদেবতাকে পূজা করেন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানী।
ইমং স্বনিগমং ব্রহ্মন্নবেত্য
মদনুষ্ঠিতম্।
অদান্মে জ্ঞানমৈশ্বর্যং
স্বস্মিন্ ভাবং চ কেশবঃ।।.৩
সরলার্থ – হে ব্যাসদেব,
আমি যখন ভগবানের আজ্ঞা এইভাবে পালন করেছি
জেনে ভগবান শ্রীহরি
আমাকে জ্ঞান-ভক্তি ও তাঁর প্রতি অনুরাগ প্রদান করেছিলেন।
ত্বমপ্যদভ্রশ্রুত বিশ্রুতং
বিভোঃ
সমাপ্যতে যেন বিদাং
বুভুৎসিতম্।
আখ্যাহি দুঃখৈর্মুহুরর্দিতাত্মনাং
সংক্লেশনির্বাণমুশন্তি
নান্যথা।।৪০
সরলার্থ – হে ব্যাসদেব,আপনি
পূর্ণজ্ঞানী , আপনি ভগবানের লীলা কথা, তাঁর প্রেমময়ী লীলার কথা বর্ণনা করুন।সেই লীলা
কাহিনীর দ্বারা বড় বড় জ্ঞানীদেরও জিজ্ঞাসা পূর্ণ হয়া যায়। সকল্প্রকার দুঃখের নিবৃত্তি
এর দ্বারাই হতে পারে, অন্য কোন পথ নেই।
============()===============
🙏💐💐🙏
ReplyDeleteপরম পূজনীয় আচার্য দেব মহারাজ জী আমার সশ্রদ্ধ ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্ৰহণ করবেন। মহারাজ আপনার PDF খাতায় লিখে নিচ্ছি। মন দিয়ে অনুধাবন করার চেষ্টা করছি। খুব ভালো লাগছে।
Deleteমহারাজ,আমি ভাগবত পিডিএফ খাতায় লিখে রাখছি।এতো পরিশ্রম করে ভাগবত আমাদের বোধগম্য করে তুলেছেন ।ঠাকুর মায়ের অসীম কৃপায় আপনার মতো আধ্যাত্মিক শিক্ষাগুরু পেয়েছি।আন্তরিক ধন্যবাদ ও ভক্তিপূর্ন প্রণাম নেবেন।
ReplyDeleteরুবী ভট্টাচার্য ইছাপুর
জয় শ্রীমৎ ভাগবত পুরাণ 🙏।
ReplyDeleteআপনার পরিশ্রমের মূল্য যেন দিতে পারি।
সশ্রদ্ধপ্রণাম মহারাজ জী 🙏।
অলকানন্দা মিত্র বাগবাজার
Maharaj aj class er agei ayee PDF peye khub khub khub upakrita hoyechi ami note kare niyechi amader sakal Adhyatmik bisoy e teaching deyoar janya apnar ayee aklanta prachesta ke sata bar antarer sraddha vakti valobasha janai 🙏🙏 Shampa Dhar🙏❤
ReplyDeleteপ্রণাম মহারাজ জী 🙏 আপনাকে কৃত জ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই , আপনার প্ররিশ্রমের মূল্য যেন দিতে পারি🙏 ঠিক অনুধ্যানের আগেই pdf পেয়ে গেলাম।
ReplyDeleteরূপা চক্রবর্তী বিশাখাপত্তনম
Pronam maharaj
ReplyDeleteজয় শ্রী ভগবান,ভাগবত কথা পড়া হয়ে গেলো! আহা, কি আনন্দ লাগছে মনে।কেন এতো মধুর শ্রী মৎ ভাগবত পুরাণ কথা!!?পূজনীয় আচার্যদেব কে সভক্তি প্রণাম জানাই।এই মহতী বিষয় অবগত হচ্ছি আপনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই জন্য অনেক,অনেক, ধন্যবাদ জানাই।নাম, বিনু চক্রবর্তী, পান্ডে। বাড়ি, মালদা।জয় ঠাকুর
ReplyDeleteআমার সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করবেন মহারাজ
ReplyDeletePranam maharajji...pdf peye bhison anandita...ato parisram amader janya korchen...amra kritagya. ❤🌹🙏🙏🌹agami saptahe jeno khuje pai...
ReplyDeleteওঁ নমঃ ভগবতেয় বাসুদেবায় নমঃ নমো I রুনা পালিত
ReplyDeleteMaharaj aj class er agei PDF peye khub upakrita hoyechi sloka gulo note karechi 🙏🙏🌹☘️
ReplyDeletePronam maharaj. Pdf peye khub upokrito holam.apnar prochesta k bhoktipurno pronam janai.dhonnyo jibon amar apnar moto acharya sannidhye aste pere.
ReplyDeleteMaharaj amar Pronam neben. Apnar moto siksha guru peye amra dhonyo. Amra onek onek samridhi hocchi. Apni amader upgrade korar jonya kothor parishram kore cholechen Amader upor Thakur , MA, Swamiji r kripa.
ReplyDeleteAaj class er aage pdf peye khub anondo pelam. Puro adhyay ti porlam mon bhore gelo. Apner aklanto prochesta amader ke protshahito kore aage barta. Pronam neben maharaj ji 🙏🙏🙏🙏
ReplyDeleteRanjita Mazumder, New Delhi
এটার ই অপেক্ষায় ছিলাম, আপনি এত ব্যস্ততার মধ্যে সময় বের কোরে আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তার যথাযোগ্য সন্মান যাতে রাখতে পারি সেই আর্শীবাদ করুন। আমার প্রণাম নেবেন মহালাজ জী।
ReplyDeleteSovakti pranam Achariyo Maharajji 🌻🌻🙏🙏
ReplyDeleteMaharaj aj class er agei Vagwat er Pdf peye khub valo lagche ami note karechi 🙏🙏
ReplyDeleteপরম পূজনীয় আচার্য দেব মহারাজ জী আপনার মতো আচার্য গুরু পাবো তা তো কোনদিন ভাবিনি। ভগবানের কৃপায় আপনাকে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করি। ভাগবত আমি লিখে রাখছি
ReplyDeleteযাতে মাঝে মাঝে দেখতে পারি।
আপনি আমার সশ্রদ্ধ ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্ৰহণ করবেন।
অপর্ণা ভট্টাচার্য। বাগবাজার।যদিও এখন অনেক দূরে আছি মেয়ে র কাছে
Scotland এ।যদিও কোন অনুধ্যান বাদ দি না।
Pronam moharaj ji 🙏🌹🙏 ১ম স্কন্ধ ৫ অধ্যায় আবারও পাঠ করে খুব উপকৃত । অসাধারন কৃপা পেয়ে ধন্য সকলে। জয় শিক্ষা গুরুর উপদেশ কথা শুনি শান্তি পাই। অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে হাজার হাজার কোটি প্রণাম মহারাজ জি 🙏🌹🙏 Anjali Biswas Naihati,
ReplyDelete