শংকরাচার্য ।। পর্ব - ৯ ।। স্বামী হরিময়ানন্দ

                          ।।  শংকরাচার্য ।।                                                                                                 ---- স্বামী হরিময়ানন্দ © ধারাবাহিক রচনা "এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্‌ আলয়ং করুণালয়ম্‌। নমামি ভগবদপাদং শংকরম্‌ লোকশংকরম্‌। =============পর্ব-৯============= মণ্ডণ পত্নী উভয় ভারতী দেবী সরস্বতীর সমতুল্য ছিলেন মণ্ডনের পত্নী। যিনি এই   বিতর্ক সভার মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এখন বললেন, হে যতীশ্বর, আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন - এ কথা সত্য। কিন্তু   আমাকে পরাজিত না করলে আপনার পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। আমি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী, কাজেই আপনার অর্ধেক বিজয় হয়েছে, সম্পূর্ণ নয়। আচার্...

#কঠোপনিষদ।। ২য় অধ্যায় ।। ৩য় বল্লী।।

 

                                                           

                  


                         ।।  কঠোপনিষদ ।।
                                             অনুবাদ ঃ স্বামী হরিময়ানন্দ

                ।।  ২য় অধ্যায় ।। ৩য় বল্লী ।।

  [এই শেষ বল্লীতে  জগৎকারণ ব্রহ্মের স্বরূপ নির্ধারিত হয়েছে ]


ঊর্ধ্মূলো৳বাক্‌শাখ এষো৳শ্বত্থঃ সনাতন।

তদেব শুক্রং তদব্রহ্ম তদেবামৃত্মুত্যতে।

তস্মিঁল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন। এতদ্বৈ তৎ।। ১।।

শব্দার্থ এষঃ এই সংসার , অশ্বত্থঃ সংসাররূপ অশ্বত্থবৃক্ষ, ঊর্ধমূলঃ ব্রহ্ম থেকে উদ্ভূত, অবাক্‌ শাখঃ নিম্নদিকে বিস্তৃত শাখা বিশিষ্ট,সনাতনঃ অনাদি প্রবাহরূপ। তদেব -তিনিই, শুক্রম্‌ - শুদ্ধ অপাপবিদ্ধ, তৎ ব্রহ্ম -  তিনি ব্রহ্ম, তৎ এব অমৃতম্‌ - তিনিই অবিনশ্বর, উচ্যতে এরূপ বলা হয়, সর্বে লোকাঃ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, তস্মিন্‌ - সেই কারণরূপ পরমব্রহ্মে, শ্রিতাঃ আশ্রিত, ক চন উ কেউই, তৎ - সেই ব্রহ্মকে , ন অত্যেতি অতিক্রম করতে পারে না। এতৎ বৈ তৎ - ইনিই সেই পরম ব্রহ্ম।

সরলার্থ এই যে সংসাররূপ বৃক্ষ, এটি অশ্বত্থ অর্থাৎ আগামী কাল থাকবে কিনা বলা যায় না, ঊর্ধ অর্থাৎ সর্বোচ্চতম ব্রহ্ম এর আদি কারণ, এর শাখা অর্থাৎ দেব-অসুরাদি  নিম্নদেশে বিস্তৃত, এবং এটি সনাতন অর্থাৎ অনাদিকাল থেকে চলে আসছে।

যদিদং কিঞ্চ জগৎ সর্বং প্রাণ এজতি নিঃসৃতম্‌।

মহদ্ভয়ং ব্জ্রমুদ্যতং য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি।।২ ।।

শব্দার্থ ইদম্‌ - এই, যৎ কিম্‌ চ যা কিছুই, জগৎ - সচল বস্তু অর্থাৎ বিশ্বচরাচরের সকল বস্তু, সর্বম্‌ -সে সমস্ত, প্রাণে মহাপ্রাণ বা পরব্রহ্ম আছেবন বলে, নিঃসৃতম্‌ - তাঁর থেকে উৎপন্ন হয়ে,  এজতি স্পন্দিত হয়। এতৎ - এই সমস্ত জগৎকরণ ব্রহ্মকে, যে যাঁরা, মহৎ ভয়ম্‌ - অত্যন্ত ভয়ঙ্কর, উদ্যতম্‌ - সমুত্থিত, বজ্রম্‌ -বজ্রের ন্যায়, বিদুঃ জানেন, তে তাঁরা, অমৃতাঃ ভবন্তি অমর বা মুক্ত হন।

সরলার্থ এই যা কিছু জগৎ তা সমস্তই পরব্রহ্ম থাকাতেই তা থেকে নির্গত হয়ে নিয়ত সচেষ্ট হচ্ছে। এই জগতের কারণ সেই ব্রহ্ম উদ্যত ব্রহ্মের মত মহৎ ভয়ের কারণ। যাঁরা এই ব্রহ্মকে জানেন তাঁরা অমর হয়ে যান।

 

ভয়াদস্যাগ্নিস্তপতি  ভয়াত্তপতি সূর্যঃ।

ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যররধাবতি পঞ্চমঃ।।৩

শব্দার্থ -  অস্য এই পরমেশ্বরের, ভয়াৎ - ভয়ে বা নিয়ন্ত্রণের ফলে, অগ্নিঃ তপতি অগ্নি তাপ দেন, ভয়াৎ তপতি সূর্যঃ এঁরই ভয়ে সূর্য তাপ বা আলো প্রদান করেন, ভয়াৎ ইন্দ্রঃ চ বায়ুঃ চ ভয়ে ইন্দ্র ও বায়ু, পঞ্চমঃ পঞ্চম স্থানীয়, মৃত্যুঃ যম, ধাবতি নিজ নিজ কার্যে প্রবৃত্ত হন।

সরলার্থ ব্রহ্মের ভয়ে অগ্নি তাপ দেয়, সূর্য তাপ দেয়। এর ভয়ে ইন্দ্র, বায়ু, এবং পঞ্চম যম ধাবিত হয়।

ইহ চেদশকদ্‌ বোদ্ধুং প্রাক্‌  শরীরস্য বিস্রসঃ।

ততঃ সর্গেষু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে।।৪

শব্দার্থ ইহ এই জীবনেই, চেৎ - যদি, বোদ্ধুম্‌ - ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে, অশকৎ - সমর্থ হন, শরীরস্য দেহের, বিস্রসঃ পতনের, প্রাক্‌ - পূর্বেই অর্থাৎ জীবদ্দশাতে,মুক্ত হন অর্থাৎ জীবন মুক্ত হন। ততঃ তা না হলে, সর্গেষু -কর্মফল ভোগের জন্য পৃথিবী ইত্যাদিতে্‌ লোকেষু লোকসমূহে, শরীরত্বায় কল্পতে দেহ বিশেষ লাভ করেন।

সরলার্থ যদি এই জন্মেই শরীর ত্যাগের আগে ভয়ের কারণ ব্রহ্মকে জানতে সমর্থ হয় তা হলে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়। আর যদি এই জন্মে ব্রহ্মকে জানতে না পারা যায়, তা হলে  পৃথিবী প্রভৃতি লোকে পুনরায়  শরীর ধারণ করতে বাধ্য হয়।

যথাদর্শে তথাত্মনি যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলোকে।

যথপ্সু পরীব দদৃশে তথা গন্ধর্বলোকে

ছায়াতপয়োরিব ব্রহ্মলোকে।।


শব্দার্থ আদর্শে স্বচ্ছ দর্পণে, যথা যেমন,[ প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যায়] তথা সে রকম,  আত্মনি শুদ্ধ বুদ্ধিতে [পরমাত্মার দর্শন বা উপলব্ধি হয়], স্বপ্নে স্বপ্নকালে, যথা যেমন সবই অস্পষ্ট বোধ হয়, তথা পিতৃলোকে সেরকম পিতৃলোকে [আত্মদর্শন অস্পষ্ট], অপ্সু জলে, যথা যেমন বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বোঝা যায় না, তথা গন্ধর্ব লোকে ইব সে রকম গন্ধর্বলোকে  আত্মাকে দেহাদির সঙ্গে সংস্পৃষ্ট বলে, পরিদদৃশে দেখা যায়, ব্রহ্মলোকে একমাত্র ব্রহ্মলোকে, ছায়া আতপয়োরিব অন্ধকার ও আলোকের মতো।

      [আত্মা ও অনাত্মার ভেদের দ্বারা সম্যক, আত্মদর্শন হয়]

সরলার্থ দর্পণে যেমন স্পষ্টভাবে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়, মনুষ্যদেহে বুদ্ধিতে তেমন স্পষ্ট আত্মজ্ঞান হয়। স্বপ্নে অস্পষ্ট দর্শনের মতো পিতৃলোকে আত্মজ্ঞান অস্পষ্ট হয়। জলে যেমন আকার দেখা যায়, গন্ধর্বলোকেও তেমন অস্পষ্ট আত্মজ্ঞান হয়। ছায়া ও রৌদ্রের ভেদের মতো ব্রহ্মলোকে স্পষ্ট আত্মজ্ঞান হয়।

 

ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগ্‌ভাবমুদয়াস্তময়ৌ চ যৎ।

পৃথগুৎপদ্যমানানাং মত্বা ধীরো ন শোচতি।। ৬

 শব্দার্থ [নিজ নিজ উৎপত্তির কারণ আকাশাদি পঞ্চভূত থেকে] পৃথক ভিন্ন ভিন্ন রূপে, উৎপদ্যমানানাম্‌  ইন্দ্রিয়াণাম্‌ - উৎপদ্যমান ইন্দ্রিয়সমূহের, পৃথগ্‌ ভাবম্‌ - আত্মা থেকে পৃথক, চ এবং , যৎ উদয়াস্তময়ৌ তাদের উৎপত্তি ও লয়, মত্বা জেনে, ধীরাঃ বিবেকী ব্যক্তি, ন শোচতি শোক করেন না।

সরলার্থ পৃথক পৃথক ভূত থেকে উৎপন্ন ইন্দ্রিয়গুলির পৃথক স্বভাব আত্মা থেকে পৃথক এবং জাগ্রৎকালে যে উদয় ও নিদ্রাকালে লয় তা ইন্দ্রিয়ের ধর্ম, আত্মার নয়, - এটি জেনে বুদ্ধিমান ব্যক্তি শোক করেন না।

 

ঈন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ মনসঃ সত্ত্বমুত্তমম্‌।

সত্ত্বদধি মহানাত্মা মহতো৳ব্যক্তমুত্তমম্‌।।৭

শব্দার্থ ইন্দ্রিয়েভ্যঃ ইন্দ্রিয় সমূহ থেকে, মনঃ মন, পরম্‌ - শ্রেষ্ঠ, মনসঃ মনের থেকে, সত্ত্বম্‌ উত্তমম্‌ -  বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, সত্ত্বাৎ - বুদ্ধির থেকে, মহান্‌ আত্মা সমষ্টি বুদ্ধি বা হিরণ্যগর্ভ, অধি বড় বা শ্রেষ্ঠ, অব্যক্তম্‌ - প্রকৃতি বা মায়া, মহতঃ মহৎতত্ত্ব বা হিরণ্যগর্ভ, উত্তমম্‌ - শ্রেষ্ঠ।

সরলার্থ ইন্দ্রিয় অপেক্ষা মন শ্রেষ্ঠ, মনের থেকে বুদ্ধি উওম, ব্যষ্টি বুদ্ধি অপেক্ষা হিরণ্যগর্ভ অর্থাৎ সমষ্টি বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, হিরণ্যগর্ভ থেকে মায়া শ্রেষ্ঠ।

 

অব্যক্তাত্তু পরঃ পুরুষো ব্যাপকো৳লিঙ্গ এব চ ।

যং জ্ঞাত্বা মুচ্যতে জন্তুরমৃত্ত্বং চ গচ্ছতি।। ৮

 

শব্দার্থ তু কিন্তু,ব্যাপকঃ সর্বব্যাপী, অলিঙ্গঃ চ এবং সর্বধর্মবিবর্জিত, পুরুষঃ এব পরমাত্মাই , অব্যক্তাৎ - প্রভৃতি থেকে, পরঃ শ্রেষ্ঠ। যম্‌ - যাঁকে, জ্ঞাত্বা জেনে, জন্তুঃ জীব , মুচ্যতে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়, অমৃতত্বম্‌ চ গচ্ছতি এবং অমৃতত্ব লাভ করে।

সরলার্থ জীব যাঁকে জেনে জীবন্মুক্ত হয় এবং শরীর ত্যাগের পর কৈবল্যমুক্ত হয়, সে সর্বব্যাপী, বুদ্ধিপ্রভৃতি লিঙ্গ রহিত পুরুষ কিন্তু অব্যক্ত থেকে শ্রেষ্ঠ।

 

আত্মাকে জানার উপায় বলছেন --

ন সন্দৃশে তিষ্ঠতি রূপমস্য ন চক্ষুষা পশ্যতি কশ্চনৈনম্‌।

হৃদা মনীষা মনসাভিক্লৃপ্তো য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি।।৯

 

শব্দার্থ অস্য রূপম্‌ - এঁর স্বরূপ, সন্দৃশে দর্শন তথা ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে, ন তিষ্ঠতি থাকে না, কঃ চন কেউই, এনম্‌ - এই পুরুষকে, চক্ষুষা চক্ষু অথবা কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা, ন পশ্যতি জানতে পারে না। হৃদা মনীষা হৃদয়স্থ নিশ্বয়াত্মিকা বুদ্ধি দ্বারা, মনসা মননের ফলে, অভিক্লৃপ্তঃ -প্রকাশিত বা বিজ্ঞাত হন। যে যাঁরা, এতৎ - এই পুরুষকে, বিদুঃ জানেন, তে তাঁরা, অমৃতাঃ অমর বা মুক্ত, ভবন্তি হন।

সরলার্থ এই আত্মার স্বরূপ, জ্ঞানের বিষয় হয় না। এই আত্মাকে কেউ চোখ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় দিয়ে দেখতে পায় না। জ্ঞানের উপায় সম্যক বিচাররূপ মননের দ্বারা আত্মাকে হৃদয়স্থিত মনের নিয়ামক বিষয়কল্পনা শূন্য বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা অবিষয়রূপে জানা যায়। যাঁরা এই ব্রহ্মাত্মাকে জানেন তাঁরা মুক্ত হয়ে যান।


যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ।

বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টতি তামাহুঃ পরমাং গতিম্‌ ।। ১০

 

শব্দার্থ যদা যখন,  পঞ্চ পাঁচটি, জ্ঞানানি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মনসা সহ মনের সঙ্গে, [নিজ নিজ বিষয়ের প্রতি ধাবিত না হয়ে ব্যাপারশূন্যরূপে] অবতিষ্ঠতি অবস্থান করে, বুদ্ধিঃ চ বুদ্ধিও , ন বিচেষ্টতি কোন বিষয়ে ব্যাপৃত হয় না, তাম্‌ - সেই অবস্থাকে, পরমাম্‌ গতিম্‌ - জ্ঞানের পরম সাধন, আহুঃ -বলেন।

সরলার্থ যখন পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় মনের সঙ্গে আত্মাতেই অবস্থান করে অর্থাৎ মনের সঙ্গে  জ্ঞানেন্দ্রিয়ের ব্যাপার নিবৃত্ত হয়ে যায় এবং বুদ্ধিও নিজ ব্যাপার করে না তখন সেই অবস্থাকে অর্থাৎ ইন্দ্রিয়, মন বুদ্ধির সেই অবস্থাকে  পরমগতি বলে।

তাং যোগমিতি মন্যন্তে স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্‌ ।

অপ্রমত্তস্তদা ভবতি যোগো হি প্রভবাপ্যয়ৌ ।।১১

 

শব্দার্থ স্থিরাম্‌ -নিশ্চলভাবে, [ বিষয়সকল থেকে প্রত্যাহার করে] তাম্‌ ইন্দ্রিয়ধারণাম্‌ - সে ইন্দ্রিয়গণের ধারণাকে , যোগম্‌ ইতি যোগ বলে, মন্যন্তে মনে করা হয়।  তদাঃ যোগে প্রবৃত্ত হওয়ার সময়, অপ্রমত্তঃ ভবতি প্রমাদ রহিত হন, হি কারণ, যোগঃ যোগ, প্রভব অপ্যয়ৌ উৎপত্তি ও বিনাশ উভয়ের হেতু।

সরলার্থ যোগিগণ ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির সেই স্থির ধারণা অবস্থাকে যোগ বলে মনে করেন। যোগ অরম্ভ করার সময় সাবধান হবে। যেহেতু যোগ উৎপত্তি ও বিনাশধর্ম বিশিষ্ট।

নৈব বাচা ন মনসা প্রাপ্তুং শক্যো ন চক্ষুষা।

অস্তীতি ক্রবতো৳ন্যত্র কথং তদুপলভ্যতে।। ১২

শব্দার্থ বাচা ন  বাক্যের দ্বারা নয়,  মনসা ন মনের দ্বারা নয়, চক্ষুষা এব চোখ প্রভৃতি কোন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা নয়, ন প্রাপ্তুম্‌ শক্যঃ এই আত্মাকে জানা যায় না। অস্তি ইতি আত্মা আছেন এরূপ, ব্রুবতঃ -যিনি বলেন, অন্যত্র অন্যকোন নাস্তিক ব্যক্তির কাছে, কথম্‌ - কিভাবে , তৎ - তাঁকে, উপলভ্যতে জানা যাবে?

সরলার্থ সেই আত্মাকে বাগিন্দ্রিয়ের দ্বারা , মনের দ্বারা বা চক্ষুর দ্বারা জানা সম্ভবই নয় অর্থাৎ কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় বা অন্তঃকরণের দ্বারা আত্মাকে জানা সম্ভব নয়। তা হলেও জগতের মূল আত্মা আছেন তা উপলব্ধি করতে হবে। যেহেতু আত্মা আছেন এরূপ আস্তিক ভিন্ন নাস্তিকের নিকট কিভাবে ব্রহ্মাত্মার উপলব্ধি হবে?

অস্তীত্যেবোপলব্ধব্যস্তত্ত্বভাবেন চোভয়ো;।

অস্তীত্যেবোপলব্ধস্য তত্ত্বভাবঃ প্রসীদতি।। ১৩

 

শব্দার্থ অস্তি ইতি এই আত্মা আছেন এই রকম, উপলব্ধব্যঃ তাকে জানতে হবে, চ এবং , তত্ত্বভাবেন নিরুপাধিক ভাবে জানতে হবে। উভয়োঃ সোপাধিক ও নিরুপাধিক এই দুই তত্ত্বের মধ্যে, অস্তি ইতি এবং উপলব্ধস্য আত্মা আছেন এই উপলব্ধিবান সাধকের কাছে, তত্ত্বভাবঃ আত্মার নিরুপাধিক সত্যরূপ, প্রসীদতি প্রকৃষ্টভাবে গোচর হয়।

সরলার্থ আত্মাকে আছেন এই ভাবে অর্থাৎ সোপাধিক ভাবে এবং তত্ত্বরূপে অর্থাৎ নিরুপাধিকভাবে উপলব্ধি করবে। সোপাধিক ও নিরুপাধিক স্বরূপের মধ্যে প্রথমে  আছেন এরূপেই নিরুপাধিক স্বরূপ সাধকের নিকট প্রকাশিত হয়।

 

যদা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যে৳স্য হৃদি শ্রিতাঃ।

অথ মর্ত্যো৳মৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে। ১৪


শব্দার্থ যদা- যখন ,অস্য সাধকের, হৃদি শ্রিতাঃ অন্তঃকরণস্থ, যে সর্বে কামাঃ যে সকল বাসনা, প্রমুচ্যন্তে সর্বতোভাবে চলে যায়, অথ তারপর, মর্ত্যঃ মরণশীল জীব , অমৃতঃ অমর , ভবতি হয়, অত্র এই দেহেই, ব্রহ্ম সমশ্নুতে ব্রহ্মভাব উপলব্ধি করেন।

সরলার্থ এই আত্মজ্ঞানী ব্যক্তির  আত্মজ্ঞানের পূর্বে বুদ্ধিতে যে কামনা সকল বিদ্যমান ছিল, সে সমস্ত  কামনা যখন নষ্ট হয়ে যায়। জ্ঞানের পূর্বে অবিদ্যা প্রভৃতি মৃত্যুবিশিষ্ট তিনি তখন অমৃত অর্থাৎ অবিদ্যাদি মৃত্যুশূন্য হয়ে যান এবং এই জন্মেই ব্রহ্মলাভ করেন।

 

যদা সর্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়স্যেহ গ্রন্থয়ঃ।

অথ মর্ত্যোঁমৃতো ভবত্যেতাবদ্ধ্যনুশাসনম্‌ ।। ১৫

শব্দার্থ যদা যখন , ইহ এই দেহেই, হৃদয়স্য হৃদ্‌গত , সর্বে সকল, গ্রন্থয়ঃ গ্রন্থি বা অবিদ্যাবন্ধন, প্রভিদ্যন্তে ছিন্ন হয়ে যায়, অথ -তখন, মর্ত্যঃ মরণশীল জীব, মানুষ,  অমৃতঃ ভবতি অমর হয়ে যায়, এতাবৎ হি এই পর্যন্তই , অনুশাসনম্‌ - শাস্ত্রীয় উপদেশ, এর অতিরিক্ত কিছু নেই।

সরলার্থ যখন হৃদয়ের সমস্ত গ্রন্থি অর্থাৎ অবিদ্যা জনিত কার্যের অভ্যাস সকল, শরীর থাকতে থাকতে বিনষ্ট হয়ে যায়, জ্ঞানের পূর্বে যিনি মরণশীল ছিলেন জ্ঞানের পর তিনি অমরণপ্রাপ্ত হন। এই হল সমস্ত বেদান্তের উপদেশ।

শতঞ্চৈকা চ হৃদয়স্য নাড্যস্তাসাং মূর্ধানমভিনিঃসৃতৈকা।

তয়োর্ধ্বমায়ন্নমৃত্বমেতি বিস্বঙঙস্যা উৎক্রমণে ভবন্তি।। ১৬


শব্দার্থ হৃদয়স্য হৃদয়ে,  শতম্‌ চ একশ, একা চ এবং একটি , নাড্যঃ নাড়ীসকল,  তাসাম্‌ - তাদের মধ্যে, একা একটি সুষুম্না নাড়ী, মূর্ধানম্‌ অভি ব্রহ্মরন্ধ্র অভিমুখে, নিঃসৃতাঃ নির্গত হয়েছে, [মৃত্যুর সময়ে] তয়া সেই নাড়ির দ্বারা, ঊর্ধ্বম্‌ - ঊর্ধ্বদিকে, আয়ন্‌ - গমন করে, অমৃতত্বম্‌ এতি অমরতা লাভ করে, বিষ্বঙ্‌ - বিভিন্ন দিকে প্রসারিত,  অন্যাঃ অন্য নাড়ীসমূহ, উৎক্রমণে ভবন্তি -  লোকান্তর প্রাপ্তির কারণ হয়।

সরলার্থ -মানুষের একশ একটি নাড়ি হৃদয় থেকে নির্গত হয়েছে। তার মধ্যে একটি নাড়ী (সুষুম্না) মস্তকের দিকে গিয়েছে। সেই নাড়ীর দ্বারা মানুষ মৃত্যুকালে ঐ নাড়ীর দ্বারা ঊর্ধদিকে প্রাণবায়ুর সঙ্গে নিষ্ক্রমণ করলে অমৃতত্ব প্রাপ্ত হয়। অন্যান্য নাড়ীতে প্রাণবায়ু নিষ্ক্রান্ত হলে নানা গতি হয়।

অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো৳ন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ।

তং স্বাচ্ছরীরাৎ প্রবৃহেন্মুঞ্জাদিবেষীকাং ধৈর্যেণ।

তং বিদ্যাচ্ছুক্রমমৃতং তং বিদ্যাচ্ছুক্রমমৃতমিতি।। ১৭

শব্দার্থ অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ অঙ্গুষ্ঠ পরিমিত, অন্তরাত্মা অন্তর্যামী , পুরুষঃ পরমাত্মা, সদা সর্বদা,  জনানাম্‌ - সকল প্রাণীর , হৃদয়ে হৃদয়ে বা অন্তঃকরণে,  সন্নিবিষ্টঃ প্রবিষ্ট হয়ে আছেন। মুঞ্জাৎ - মুঞ্জ তৃণ থেকে,ঈষীকাম্‌ ইব -  তৃণ মধ্যস্থ কোরকটি, [যেমন যত্নের সংগে বার করা হয় তেমনি] ধৈর্যেণ তিতিক্ষা সহকারে,  স্বাৎ শরীরাৎ - নিজ দেহ থেকে, তম্‌ - সেই অন্তর্যামী পুরুষকে,  প্রবৃহেৎ- -পৃথক করবে। তম্‌ - তাঁকেই , শুক্রম্‌ - শুদ্ধ, অমৃতম্‌ - অমৃত-ব্রহ্ম, বিদ্যাৎ - জানবে, তম্‌ শুক্রম্‌ অমৃতম্‌ বিদ্যাৎ ইতি তাঁকে শুদ্ধ অমৃত বলে জানবে। [সমাপ্তি সূচনার জন্য দু বার বলা হয়েছে]

সরলার্থ অঙ্গুষ্ঠ পরিমিত সকল জীবের অন্তরাত্মা পুরুষ সর্বদা তাদের হৃদয়ে অবস্থিত। মুঞ্জ তৃণ থেকে যেমন তার ইষীকাকে( গর্ভ, শীষ) ধীরে ধীরে বের করে, সেরূপ সেই অন্তরাত্মা পুরুষকে সাবধানে নিজ শরীর থেকে পৃথক করে বিচারের দ্বারা জানবে।  এবং সেই পুরুষকে নিত্য চৈতন্যস্বরূপ আত্মা বলে জানবে।

 

মৃত্যুপ্রোক্তাং নচিকেতো৳থ লব্ধা

বিদ্যামেতাং যোগবিধিং চ কৃৎস্নম্‌।

ব্রহ্মপ্রাপ্তো বিরজো৳ভূদ্বিমৃত্যু

রস্যো৳প্যেবং যো বিদধ্যাত্মমেব।। ১৮

 

শব্দার্থ অথ অনন্তর, নচিকেতঃ নচিকেতা, মৃত্যুপ্রোক্তাম্‌ - যমরাজ কর্তৃক কথিত, এতাম্‌ বিদ্যাম্‌ - এই তত্ত্বজ্ঞান,  চ কৃৎস্নম্‌ - এবং সমগ্র, যোগ বিধিম্‌ - যোগানুষ্ঠান , লব্ধ লাভ করে,  বিরজঃ সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ, বিমৃত্যুঃ মৃত্যুর কারণভূত অবিদ্যা বর্জিত হয়ে,  ব্রহ্মপ্রাপ্তঃ ব্রহ্মস্বরূপ, অভুৎ - হলেন,  অন্যঃ অপি অন্যও, যঃ -যিনি , অধ্যাত্মম্‌ এব- প্রত্যগাত্মাকেই, এবম্‌ -বিৎ - এইভাবে জানেন, তিনিও ব্রহ্ম স্বরূপ হবেন।

সরলার্থ -  অনন্তর নচিকেতা মৃত্যু কর্তৃক উপদিষ্ট এই ব্রহ্মবিদ্যা এবং উপকরণ ও ফলের সঙ্গে যোগপ্রকার প্রাপ্ত হয়ে অবিদ্যা ও কামনাশূন্য  এবং ধর্মাধর্ম শূন্য হয়ে ব্রহ্মপ্রাপ্ত হয়ে গেলেন।  অপর যে কেউ এরূপ ব্রহ্মবিৎ হন তিনিও অবিদ্যা, কামনা ও ধর্মাধর্ম শূন্য হয়ে অধ্যাত্মতত্ত্বরূপ ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন।

 

      ====================()==================

 

Comments

  1. প্রণাম মহারাজ আত্ম জ্যোতি তো পড়লাম । কিন্তু কিছুই মগজে ঢুকলো না । আমার বাবা যখন বুঝিয়ে দেন একটু ঢোকে তাও কিছুই মনে থাকে না । তবে আপনার পরিশ্রম বৃথা যেতে দেব না । আমরা মনে রাখার চেষ্টা করছি । প্রণাম বাবা ঠাকুর আপনাকে যেনো সুস্থ রাখেন এটাই কামনা করি ।

    ReplyDelete
  2. খুব সুন্দর গুরুদেব। আপনার কৃপায় এত গভীর তত্ত্ব আমরা জানতে পারলাম। ঠাকুর, মা ও স্বামীজীর আশীর্বাদে আপনি সুস্থ থাকুন। আমরা গর্বিত আপনার সাথে যুক্ত হতে পেরে।প্রণাম গুরুদেব 🌷🌷🙏🙏🙏🙏🙏🌷🌷

    ReplyDelete
  3. খুব সুন্দর মহারাজ আত্ম জ্যোতি পড়লাম বারবার পড়লে হয়ত একটু বুঝতে পারব আপনি সরল অর্থ গুলো খুব সুন্দর ভাবে বলেছেন সংস্কৃত উচ্চারণ একটু শক্ত হতে পারে কিন্তু সরলার্থ টা বারবার পড়লে হয়তো বোধগম্য হবে চেষ্টা করছি। বোঝবার এর সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন মহারাজ 🙏🌻🙏

    ReplyDelete
  4. Sovakti pranam Achariyo Maharajji 🌹🌹🙏🏻🙏🏻. Maharajii, Aponer kripa te amra ei Atmovidya Atmogyan sikhya prapti korey samridhyo hocchi 👏🙏🏻. Ar aaj 3rd Valli r detailed note peyey othibo dhonnyo, Maharajii 👏🙏🏻🙏🏻. Sosrodhyeo pranam Achariyo Maharajji 🌹🌹🙏🏻🙏🏻

    ReplyDelete
  5. 🙏🏻🙏🏻

    ReplyDelete
  6. Maharaj apni ayee gavir chinta r bisoy Atma tatwa anek sahaj sundar vasay bislesion karechen bar bar parte habe tabe class e apnar patanabanta byakhya shunte pele tabei jafi ato tuku dharana karte pari🙏☘️☘️

    ReplyDelete
  7. প্রনাম নেবেন মহারাজ।খুব ভালো লাগছে আপনার সন্নিধ‍্যে আসতে পেরে ,তা না হলে জীবনের মানটা বুঝতাম না।তার জন‍্য চিড়কৃতঞ্জতা জানাই।খুব ভালো থাকবেন এই প্রার্থনা করি ঠাকুরের কাছে।🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  8. প্রনাম মহারাজ। প্রনাম আচার্য্য দেব ।প্রনাম শিক্ষা গুরু। আপনার গভীর জ্ঞান - গর্ভ পরিবেশনার কোন বিশেষন যোগ করার যোগ্যতা আমার নেই। শুধু গভীর শ্রদ্ধা,,,,, মদনমোহন বেজ ব্যানডেল। জানাতে পারি।

    ReplyDelete
  9. কঠো উপনিষাদের পিডিএফ পেয়ে খুবই উপকৃত হয়েছি সংস্কৃতির কিছুই বুঝতাম না আপনার সান্নিধ্যে এসে আপনি যেভাবে এক এক করে বুঝিয়ে দেন এবং ব্যাখ্যা করেন বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না আপনার মত গুরু পেয়ে আমরা গর্বিত আপনার শ্রী চরণে শতকোটি প্রণাম। শিখা মন্ডল বজবজ।

    ReplyDelete
  10. মহারাজ আমার প্রণাম নেবেন

    ReplyDelete
  11. প্রণাম মহারাজ 🙏...আপনাকে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করি। আপনার কৃপায় এত কিছু জানার সৌভাগ্য লাভ করেছি আমরা ।

    ReplyDelete
  12. প্রণাম আচার্যদেব।

    ReplyDelete

Post a Comment