শংকরাচার্য ।। পর্ব - ৯ ।। স্বামী হরিময়ানন্দ

                          ।।  শংকরাচার্য ।।                                                                                                 ---- স্বামী হরিময়ানন্দ © ধারাবাহিক রচনা "এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্‌ আলয়ং করুণালয়ম্‌। নমামি ভগবদপাদং শংকরম্‌ লোকশংকরম্‌। =============পর্ব-৯============= মণ্ডণ পত্নী উভয় ভারতী দেবী সরস্বতীর সমতুল্য ছিলেন মণ্ডনের পত্নী। যিনি এই   বিতর্ক সভার মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এখন বললেন, হে যতীশ্বর, আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন - এ কথা সত্য। কিন্তু   আমাকে পরাজিত না করলে আপনার পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। আমি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী, কাজেই আপনার অর্ধেক বিজয় হয়েছে, সম্পূর্ণ নয়। আচার্...

দেবীদুর্গার মূর্তি

 

             দেবীদুর্গার মূর্তি


   ©                                                      -- স্বামী হরিময়ানন্দ

     দেবী দুর্গাকে   শিব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ শঙ্খ, অগ্নি শক্তি দান করলেন। বায়ু ধনুক এবং বাণে পূর্ণ দুটি তূণ দিলেন। আপন বজ্র থেকে বজ্র উৎপন্ন করে ইন্দ্র তাঁকে সমর্পণ করলেন এবং আপন বাহন গজরাজ ঐরাবতের গলা থেকে ঘন্টা খুলে দিলেন দেবীর হাতে। কালদণ্ড থেকে দণ্ড উৎপন্ন করে সেটি উপহার দিলেন যমরাজ। বরুণ দিলেন আবার দিলেন পাশ। দক্ষ প্রজাপতি তাঁকে অক্ষমালা দান করলেন। ব্রহ্মার দান হল কমণ্ডলু।সূর্য তাঁর সমস্ত রোমকূপে আপন রশ্মি অনুপ্রবেশিত করলেন। 

     কাল নিবেদন করলেন খড়্গ এবং ঢাল।ক্ষীরসমুদ্র উপহার দিলেন উজ্জ্বল হার, চিরনূতন দুটি বসন,দিব্য চূড়ামণি, দুটি কুণ্ডল, সব হাতের যোগ্য বালা, শুভ্র অর্ধচন্দ্র, সমস্ত বাহূতে কেযূর, দুই চরণের জন্য দুটি নুপুর,অনবদ্য গ্রীবাভূষণ এবং সব আঙ্গুলের জন্য আংটি।কুঠার, নানা রকমের অস্ত্র এবং বর্ম দিলেন বিশ্বকর্মা।সমুদ্র দেবীর মস্তকে ও বক্ষে দান করলেন পদ্মমালা হিমালয় দিলেন সিংহ ও নানা প্রকার রত্ন।

বৈদিক সাহিত্যে দুর্গা

   মানব জাতির ইতিহাসের লিখিত প্রাচীন একমাত্র গ্রন্থ ঋগ্বেদঋগ্বেদের দশম মন্ডলে দেবীসূক্ত দেবী দুর্গাকে সমস্ত দেবতার মাতা এবং শক্তিদাত্রী বলা হয়েছেদেবী নিজেকে সমগ্র জগতের ঈশ্বরী, অন্তর্যামিনী, ধনদাত্রী, ব্রহ্মস্বরূপিনী বলে প্রকাশ করেছেনএই বেদ মন্ত্রের প্রতিধ্বনি শোনা যায় শ্রীশ্রীচণ্ডীতে ইত্থং

তৈত্তিরীয় আরণ্যকের যাজ্ঞিকা উপনিষদে দুর্গা গায়ত্রী কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারী ধীমহি তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াৎ দুর্গা পূজার একটি বিশেষ মন্ত্র।কেনোপনিষদে উমা-হৈমবতীর উপাখ্যান সর্বজন বিদিত। পরব্রহ্মই রূপ পরিগ্রহ করে সেখানে উমা নামে প্রকাশিত। এই হৈমবতী উমাই পরবর্তীকালে গিরিরাজ ও মেনকার আদরের কন্যা উমারূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

নারায়ণ উপনিষদে  দেবী দুর্গাকে প্রণাম জানানো হয়েছে একটি অপূর্ব সুন্দর মন্ত্রে

তামগ্নিবর্ণাং তমসা জ্বলন্তীং/বৈরোচনীং কর্মফলেষু জুষ্টাম্‌।/দুর্গাদেবীং শরণমহং প্রপদ্যে, সুতরসি

তরসে নমঃ।। -- অগ্নিবর্ণ সদৃশী, সন্তাপের দ্বারা আমাদের শত্রুবিনাশিনী।

মহাভারতে দুর্গা

        মহাভারতের দুজন প্রধান পুরুষ যুধিষ্ঠির ও অর্জুন দুর্গতি থেকে পরিত্রাণের জন্য দুবার দুর্গাদেবীর স্তব করেছেন। পঞ্চপাণ্ডব বারবছর বনবাসের পর এক বছর অজ্ঞাতবাসের জন্য বিরাটরাজার পুরীতে প্রবেশের আগে নির্বিঘ্নে অজ্ঞাতবাস কাটাবার জন্য ঋষিদের উপদেশ অনুসারে ভাইদের সঙ্গে নিয়ে যুধিষ্ঠির দেবীদুর্গার স্তব করেন শরণং ভব মে দুর্গে শরণ্যে ভক্তবৎসলে।- হে শরণাগতপালিকে, ভক্তবৎসলে দুর্গে,আমি আপনার শরণাগত,আমাদের রক্ষা করুন। দেবী,স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের বর দিলেন হে পাণ্ডবগণ, আমি প্রসন্না হয়ে বলছি, তোমরা বিরাটনগরে থাকাকালে কেউই তোমাদের চিনতে পারবে না এবং অচিরে তোমরা কৌরবদের পরাজিত করে নিষ্কন্টক রাজ্য ভোগ করবে।

       আর একবার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রারম্ভে যুদ্ধে জয়লাভ কামনা করে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে নতজানু হয়ে করজোড়ে দেবী দুর্গার স্তব করেছিলেন স্কন্দমাতর্ভগবতি দুর্গে কান্তার বাসিনি। জয়ো ভবতু মে নিত্যং ত্বৎপ্রসাদাৎ রণাজিরে।। দেবী প্রশন্ন হয়ে বর দিলেন। হে বীর! নারায়ণ তোমার সহায়। তুমি অল্পসময়ের মধ্যেই শত্রুগণকে পরাজিত করবে।

রামায়ণে দুর্গা

        শরত কালের দুর্গা পূজাকে বলা হয় অকালবোধন। বৃহন্নন্দিকেশর পুরাণে দেবীর বোধন মন্ত্রে বলা হয়েছে অকালে ব্রহ্মণা বোধো দেব্যাস্তয়ি কৃতঃ পুরাএই মন্ত্র থেকেই অকালবোধন কথাটি নেওয়া হয়েছে। এ অকাল বোধন হয়েছিল রাবণ বধের জন্য –“রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ’’কৃত্তিবাসী রামায়ণে পাওয়া যায় শ্রীরামচন্দ্র নিজে অকালবোধন করে একশ আট নীল পদ্ম দিয়ে দুর্গা পূজা করেছিলেন। তবে এই কাহিনী বাল্মীকি রামায়ণে নেই।

পুরাণে দুর্গা

     আঠারটি মহাপুরাণ এবং আঠারটি উপপুরাণের মধ্যে দেবীভাগবত, শ্রীমদ্‌ভাগবত,মার্কন্ডেয় পুরাণ,দেবীপুরাণ,বৃহন্নন্দিকেশর পুরাণ এবং কালিকা পুরাণে দুর্গা বিষয়ক তত্ত্ব প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। দেবী ভাগবতে যেমন দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা মুখ্য হলেও স্থান বিশেষে অন্যান্য তত্ত্বস্থান পেয়েছে, তেমনি শ্রীমদ্‌ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণের মহিমাকীর্তন প্রধান উদ্দ্যেশ্য হলেও প্রসঙ্গত যোগমায়ার আবির্ভাব এবং ব্রজমন্ডলে গোপাঙ্গনাদের কৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য কাত্যায়নী দুর্গার আরাধনা প্রভৃতি দেবী বিষয়ক অনেক কথা পাওয়া যায়দুর্গা পূজার অপরিহার্য অঙ্গ শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্য পাঠ। এটি মার্কণ্ডেয়পুরাণে অংশ।

ন্ত্রে দুর্গা

    বৈদিক কাল থেকে দুর্গাতত্ত্বের  যে ধারাটি চলে আসছিল, সেটি সম্পূর্ণতা লাভ করেছে তন্ত্রে।

     ন্যাস শব্দটি এসেছে নি পূর্বক অস্‌ ধাতু থেকে যার অর্থ হল নির্দিষ্ট ভাবে স্থাপন করা। দেহের বিভিন্ন অংগে দেবতারূপী পরমাত্মার অবস্থান চিন্তা করা।দেবতা হয়ে দেবতার অর্চনা করা। অর্থাৎ সাধকের মনটি দেবভাবে যাতে পূর্ণ হয়, সেই উদ্দেশ্য। মানুষ স্বরূপতঃ দেবতা, ন্যাসের দ্বারা তার মনে সেই ভাবটি প্রবল ও দৃঢ় করে দেওয়া হয়। তান্ত্রিক পূজায় ন্যাস বিভিন্ন প্রকারের হয়। করন্যাস ,অঙ্গন্যাস, মাতৃকান্যাস, অন্তর্মাতৃকা ন্যাস,বাহ্যমাতৃকা ন্যাস,সংহারমাতৃকা ন্যাস, বর্ণন্যাস,ব্যাপক ন্যাস,ত্তত্বন্যাস, ষোড়ান্যাস ঋষ্যাদি ন্যাস,পীঠন্যাস ইত্যাদি। দেহের প্রতিটি অঙ্গের উপর কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করে অনাসক্তি হওয়ার শিক্ষা কর ও অঙ্গন্যাসের তাৎপর্য। স্বর ও ব্যঞ্জন

     মনে প্রশ্ন উঠতে পারে বর্তমান সামাজিক পটভূমিকায়, এই বিস্ময়কর বিজ্ঞানের যুগে, ক্রমবর্ধমান নাস্তিকতার যুগে এই সবের উপর মানুষের কি বিশ্বাস আছে? বিশ্বাস থাক বা না থাক, তাতে কিন্তু যা চিরকাল সত্য তা মিথ্যা হয়ে যাবে না।

  বাংলার ঘরে ঘরে মায়ের আগমনী বেজে উঠেছে কয়েক দিন থেকেই। মেঘমুক্ত নীল আকাশ, কাশের গুচ্ছ, শিউলির মিষ্টি গন্ধ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দে মেতে উঠেছে চারিদিক। মা আসছে।  দেবীভাগবতে বলা হয়েছে  বিশ্বমূর্তে দয়ামূর্তে ধর্মমূর্তে নমো নমঃ/ দেবমূর্তে জ্যোতির্মূর্তে জ্ঞানমূর্তে নমো৳স্তু তে- সেই নিখিল মাতৃসত্তায় দয়া, ধর্ম, দেবত্ব চেতনাতে উজ্জ্বল, জ্ঞানেও দীপ্তিমান। এই মায়েরই তো বোধন করতে হয়। নিদ্রীতা দেবীকে জাগাতে হয়।

মার্কণ্ডেয় পুরাণে

  মার্কণ্ডেয় পুরাণের উপাখ্যান অনুসারে রাজা সুরথ দেবীর পূজা করেছিলেন বসন্ত কালে।তখন ছিল উত্তরায়ণ। পুরাণমতে দেবতারা তখন জেগে থাকেন। তাই সেই পুজোতে বোধন ছিল না। শরৎকাল দক্ষিণায়নের মধ্যে পড়ে। দেবতারা নিদ্রিত। তাই এই অকাল বোধন।

 শিশু যেমন সব কিছুতে মায়ের উপর নির্ভরশীল আমরা তেমন জগজ্জননী মহামায়ার উপর নির্ভরশীল নানা নামে নানা ভাবে জীবনের বিভিন্ন অবস্থাতে  সেই একই মাকেই আমরা প্রার্থনা করিজন্মকালে তিনি ষষ্ঠীরূপে রক্ষা করেন রোগে তিনি শীতলা, কৈশোরে তিনি বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী, যৌবনে তিনি ঐশ্বর্য ও সম্পদ দান করেন মহালক্ষ্মীরূপে আবার তিনি গুরুরূপে ব্রহ্মজ্ঞান দান করেনঅন্তিমে তিনি মুক্তিদাত্রী মহাদেবী সকল অবস্থাতে তিনি জগদ্ধাত্রী, অন্নপূর্ণা, বিপত্তারিনী,ভগবতীরূপে পরিপালন করেন।©

 

   

   

 

 

 

 

 

 

Comments

  1. জগজ্জননী মহামায়ার অপূর্ব রূপ বর্ণনা 🙏🏻
    অনন্ত শ্রদ্ধা ও প্রণাম মহারাজ 🙏🏻🙏🏻🙏🏻

    কৃষ্ণা মুখার্জী ,হাওড়া

    ReplyDelete
  2. আমার পূজনীয় গুরুজীর পবিত্র লেখনী স্পর্শে মৃন্ময়ী মায়ের রূপ চিন্ময়ী হয়ে উঠেছে। আত্মজ্যোতির পেজে শারদীয়া দুর্গোৎসব বেশ অভিনব..সত্যিই সুন্দর কিন্তু! মহালয়া থেকে - পিতৃপক্ষ-দেবীপক্ষ, বেলুড় মঠে দূর্গা পূজা, অপূর্ব বর্ণনাময় কুমারী পূজা, পূণ্য প্রাতে কত সুন্দর চণ্ডী পাঠ, পবিত্র মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি, কত স্তব স্তুতি সহ বিজয়া-বিসর্জন - দারুন সুন্দর এক পবিত্র পূজা পরিক্রমা! খুব ভালো লেগেছে মহারাজ। পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজীর শ্রীচরণ যুগলে আমার স্বভক্তি প্রণাম নিবেদন করি। সুস্থ ও ভালো থাকার আন্তরিক শুভ কামনা..
    🙏❣️🙏জয় মা।🙏❣️🙏

    ReplyDelete

Post a Comment