শংকরাচার্য ।। পর্ব - ৯ ।। স্বামী হরিময়ানন্দ

                          ।।  শংকরাচার্য ।।                                                                                                 ---- স্বামী হরিময়ানন্দ © ধারাবাহিক রচনা "এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্‌ আলয়ং করুণালয়ম্‌। নমামি ভগবদপাদং শংকরম্‌ লোকশংকরম্‌। =============পর্ব-৯============= মণ্ডণ পত্নী উভয় ভারতী দেবী সরস্বতীর সমতুল্য ছিলেন মণ্ডনের পত্নী। যিনি এই   বিতর্ক সভার মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এখন বললেন, হে যতীশ্বর, আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন - এ কথা সত্য। কিন্তু   আমাকে পরাজিত না করলে আপনার পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। আমি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী, কাজেই আপনার অর্ধেক বিজয় হয়েছে, সম্পূর্ণ নয়। আচার্...

ঈশোপনিষদ্‌ // ishopanishad

 

                      ঈশোপনিষদ্‌         

                            অনুবাদঃ স্বামী হরিময়ানন্দ


















                                  শান্তিমন্ত্র পাঠ

                      ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে

                        পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।

                         ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ।।


অন্বয় ওঁ ( ব্রহ্মের স্বরূপ) অদঃ (কারণরূপে অবস্থিত ব্রহ্ম, বুদ্ধির অতীত যিনি) পূর্ণম্‌ (তিনি পূর্ণ) ইদং ( নাম ও রূপে অবস্থিত ব্রহ্ম,  জগৎ) পূর্ণম্‌ (তিনিও পূর্ণ) পূর্ণাৎ ( এই পূর্ণব্রহ্ম    থেকে) পূর্ণম্‌ (হিরণ্যগর্ভ পূর্ণব্রহ্ম) উদচ্যতে (অবতীর্ণ, উৎপন্ন হয়েছে) পূর্ণম্‌ (বিরাট) পূর্ণস্য আদায় ( পূর্ণের মহিমা গ্রহণ করে) পূর্ণমেব (পূর্ণই) অবশিষ্যতে (অবশিষ্ট থাকে)


সরলঅর্থ - সেই পরব্রহ্ম সর্বপ্রকারে সদা সর্বদা পরিপূর্ণ। এই সব সূক্ষ্ম ও স্থূল পদার্থ পূর্ণব্রহ্ম থেকে অভিব্যক্ত হয়েছে। সেই পূর্ণস্বভাব ব্রহ্ম থেকে পূর্ণত্ব গ্রহণ করলেও পূর্ণই অর্থাৎ পরব্রহ্মই অবশিষ্ট থাকেন। ত্রিবিধ বিঘ্নের শান্তি হোক।

 

 

          ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।

             তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ধনম্‌।। ১ ।।

অন্বয় - জগত্যাং (অখিল ব্রহ্মাণ্ডে) যৎ কিম্‌ চ (যা কিছু) জগৎ (নিয়ত পরিবর্তনশীল, বিকারী, অনিত্য) ইদং সর্বং (এই সমস্ত)  ঈশা (পরমেশ্বরের দ্বারা) বাস্যম্‌ (ব্যপ্ত আছে) তেন (সেই কারণে) ত্যক্তেন (ত্যাগের দ্বারা বা আসক্তিশূন্য হয়ে) ভুঞ্জীথাঃ ( আত্মাকে পালন করতে বা আত্মতত্ত্ব অনুভব করতে হবে)। মা গৃধঃ (ধনবিষয়ক লোভযুক্ত আকাঙ্খা করো না) [যেহেতু] কস্যস্বিৎ ধনম্‌ (ধন কার?) [ আত্মা ব্যাতিত কোন পদার্থ বর্তমান না থাকায়, ধনের আকাঙ্খা মিথ্যা]

সরল অর্থ পরিবর্তনশীল অখিল বিশ্বব্রহ্মান্ডে সবকিছুই পরমেশ্বর দ্বারা আবৃত। এ জগতের কোন অংশ তাঁর থেকে পৃথক নয়। ত্যাগ অনুশীলনের দ্বারা চৈতন্যস্বরূপ আত্মায় প্রতিষ্ঠিত হও। অপরের ধনে লোভ কর না, কারণ মিথ্যা বিষয়ে আকাঙ্খা করা সঙ্গত নয়।


https://youtube.com/playlist?list=PLhxjjaCxBV2_rlI2JJXVv-RTMR2x489kQ

                                  কর্মের প্রসংশা

                    কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতং সমাঃ।

                 এবং ত্বয়ি নান্যথেতো৳স্তি ন কর্ম লিপ্যতে নরে।। ২।।

অন্বয় - ইহ (এই জগতে ) কর্মাণি (শাস্ত্রবিহিত কর্মসমূহ) কুর্বন্এব ( সম্পাদন করেই) শতং সমাঃ (শতবর্ষ পর্যন্ত) জিজীবিষেৎ (বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে) এবম্‌ ( এই ভাবে) ত্বয়ি নরে ( তোমার মত মনুষ্যে) কর্ম (সকাম বা অশুভ কর্ম) ন লিপ্যতে ( জড়াবে না) ইতঃ ( এ ছাড়া) অন্যথা ( অন্য কোন উপায় ) ন অস্তি ( নেই)

সরল অর্থ - আত্মজ্ঞান লাভে অসমর্থ ব্যক্তি পৃথিবীতে  শাস্ত্রবিহিত ও আশ্রমোচিত কর্ম করেই শত বছর জীবিত থাকতে ইচ্ছা করবে কর্মের ফল ত্যাগ করে বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী নিত্যকর্ম করতে হবে এর ফলে চিত্তবৃত্তি নির্মল হবে এবং মন নিবৃত্তির দিকে যেতে প্রস্তুত হবে এ ছাড়া আর অন্য কোন উপায় নেই

                              অজ্ঞানের নিন্দা

                  অসুর্যা নাম তে লোকা অন্ধেন তমসা৳বৃতা।

                তাংস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনো জনাঃ।।৩।।

অন্বয় - অসুর্যা নাম ( অসুর অর্থাৎ ভোগাসক্ত জীবদের বাসযোগ্য) অথবা অসূর্যা (আলোকহীন) তে লোকাঃ (সেই সমস্ত লোক অশুভ কর্মফল ভোগের স্থান বা জন্ম) অন্ধেন তমসা (ঘোর অন্ধকার দ্বারা আচ্ছন্ন) যে কে চ ( যে কেউ) আত্মহনঃ জনাঃ (আত্মঘাতী লোক অর্থাৎ অবিদ্বান যারা) তে (তারা) প্রেত্য (প্রাপ্ত শরীর পরিত্যাগ করে) তান্‌ ( ঐ সব স্থান বা জন্মকে) অভিগচ্ছন্তি (প্রাপ্ত হন)

সরল অর্থ যারা অজ্ঞানতা প্রযুক্ত নিজ স্বরূপ বুঝতে পারে না তারাই আত্মঘাতী আত্মঘাতী প্রারব্ধ শরীর পরিত্যাগ করে নিজ কর্ম অনুযায়ী নিবিড় অজ্ঞানরূপ অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন সূর্যহীন লোক অথবা অসুরলোক প্রাপ্ত হন।

                              আত্মার স্বরূপ

              অনেজদেকং মনসো জবীয়ো নৈনদ্দেবা আপ্নুবন্‌ পূর্বমর্ষৎ।

           তদ্ধাবতো৳ন্যানত্যেতি তিষ্ঠত্তস্মিন্নপো মাতরিশ্বা দধাতি।। ৪ ।।

    অন্বয় - অনেজৎ (নিশ্চল) একং (অদ্বিতীয়) [অথচ] মনসঃ (মন অপেক্ষাও) জবীয়ঃ (অধিক তীব্র গতিযুক্ত) এনৎ (এই পরমেশ্বরকে) দেবাঃ (ইন্দ্রিয়গণ বা দেবগণ) ন আপ্নুবন্‌ (লাভ করতে পারে না বা জানতে পারে না) পূর্বং (মনের পূর্বেই) অর্ষৎ (ইনি গমন করেছেন) তৎ (সেই) তিষ্ঠৎ ( গতিহীন ব্রহ্ম) ধাবতঃ ( চলমান) অন্যান্‌ (অন্য সকল পদার্থকে) অতি এতি (অতিক্রম করে যান) তস্মিন্‌ (সেই সৎস্বরূপে) মাতরিশ্বা (প্রাণরূপী সূত্রাত্মা বা হিরণ্যগর্ভ) অপঃ ( জল অর্থাৎ জীবের কর্মফল) দধাতি (পৃথক পৃথকভাবে সম্পাদন করেন)

  সরল অর্থ সেই ব্রহ্মবস্তু নিশ্চল, অকম্প ও এক অথচ মনের চেয়েও বেগবান বেগবান ইন্দ্রিয়গণ পর্যন্ত এর পেছনে পড়ে থাকে কারণ মনের পূর্বেই ইনি সর্বত্র বর্তমান রয়েছেন তিনি স্থির থেকেও অপরাপর দ্রুতগামী সকলকে অতিক্রম করেন এঁরই সাহায্যে মাতরিশ্বা বা বিশ্ববিধাতা সমস্ত কর্ম ও কর্মফল যথাযথ ভাগ করে দেন

                               আত্মার স্বরূপ

                   তদেজতি তন্নৈজতি তদ্দুরে তদ্বন্তিকে।

                 তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ।। ৫

অন্বয় - তৎ (সেই ব্রহ্ম) এজতি (গমন করেন) তৎ (সেই ব্রহ্ম) ন এজতি ( অচল, চলেন না) তৎ ( সেই ব্রহ্ম) দূরে (দূর থেকেও বহু দূরে) তৎ উ অন্তিকে ( তিনি অত্যন্ত নিকটে) তৎ (তিনি) অস্য সর্বস্য ( এই সমুদয় জগতের) অন্তঃ (অন্তরে, মধ্যে পরিপূর্ণ) তৎ উ (তিনিই আবার) অস্য সর্বস্য (এই দৃশ্য জগতের) বাহ্যতঃ (বাইরেও পরিপূর্ণ)

সরল অর্থ ব্রহ্ম ধ্রুব ও শাশ্বত হলেও অজ্ঞানীর  কাছে তিনি চলমান বলে প্রতীত হন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে  তিনি অন্তরের থেকে অন্তরতম কিন্তু অজ্ঞানী তাঁর স্বরূপ জানেন না, তাই দূরে বলে মনে হয়। তিনি বিভূ ও সূক্ষ্ম বলে এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরে ও বাইরে বর্তমান

                             আত্মজ্ঞানীর আচরণ

                      যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।

                  সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।। ৬

অন্বয় - তু যঃ (কিন্তু যে মানুষ ) সর্বাণি ভূতানি (সকল প্রাণিগণকে ) আত্মনি এব ( আত্মাতেই অর্থাৎ আত্মা থেকে অভিন্ন ভাবে) অনুপশ্যতি (নিরন্তর দেখেন) চ (এবং) সর্বভূতেষু (সমস্ত প্রাণিগণের মধ্যে) আত্মানম্‌ (আপন আত্মাকে অর্থাৎ অপরের মধ্যেও নিজ আত্মস্বরূপ দেখেন) [তিনি] ততঃ ( এই কারণেই অভিন্ন সর্বাত্ম দর্শনের ফলে) [কাকেও] ন বিজুগুপ্সতে (ঘৃণা করেন না)।

সরল অর্থ যিনি সর্বভূতকে আত্মাতে এবং আত্মাকেই সর্বভূতে দর্শন করেন তিনি সেই কারণেই কাকেও ঘৃণা করেন না।

                                আত্মজ্ঞের প্রকৃতি

                   যস্মিন্‌ সর্বাণি ভূতান্যাত্মৈবাভূদ্‌বিজানতঃ।

                  তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ।।৭

 অন্বয় - যস্মিন্‌ (যে কালে বা অবস্থাতে) সর্বাণি ভূতানি
(সমস্ত সৃষ্ট পদার্থ) আত্মা এব (আত্মাই) অভূৎ (হয়) তত্র (সেই কালে বা অবস্থাতে অর্থাৎ আত্মজ্ঞানের পর) একত্বম্‌ অনুপশ্যতঃ ( একত্ব দর্শনে সমর্থ, সমস্ত বস্তু ও জীবকে নিজ আত্মা থেকে অভিন্ন ভাবে ধারণায় অভ্যস্ত) বিজানতঃ (জ্ঞানী ব্যক্তির) কঃ মোহঃ (মোহই বা কী) কঃ শোকঃ (শোকই বা কী)।
[তিনি শোক-মোহ শূন্য হয়ে যান এবং সর্বদা আনন্দে পরিপূর্ণ থাকেন]

সরল অর্থ তত্ত্বজ্ঞানীর কাছে প্রপঞ্চ বলে কোন পদার্থ নেই, একমাত্র ব্রহ্মই জগৎ ব্যপ্ত করে রয়েছেনপুরুষের আত্মাতে যখন এই অনুভূতি হয়, তখন সকল মোহের কারণ আবরণ এবং শোকের কারণ বিক্ষেপ তিরোহিত হয়। সুতরাং তখন শোকও মোহ আর থাকতে পারে না।

                         পরমেশ্বর সগূণ ও নির্গুন

             স পর্যগাচ্ছুক্রমকায়মব্রণমস্নাবিরং শুদ্ধমপাপবিদ্ধম্‌।

      কবির্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ংভূর্যাথাতথ্যতো৳র্থান্‌ ব্যদধাচ্ছাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ।।৮

 অন্বয় - সঃ (সেই পরমাত্মা বা ব্রহ্ম) পর্যগাৎ (সর্বব্যাপী) শুক্রম্‌ (জ্যোতির্ময়) অকায়ম্‌ (যার কোন শরীর নেই) অব্রণম্‌ (অক্ষত) অস্নাবিরং( শিরাবিহীন) শুদ্ধম্‌ (নির্মল) কবিঃ (ক্রান্তদর্শী, ত্রিকালজ্ঞ) মনীষী (মনেরও নিয়ন্তা) পরিভূঃ (সর্বত্র বিরাজমান) স্বয়ম্ভূঃ (স্বয়ং স্রষ্টা) শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ (অনাদিকাল থেকে) যাথাতথ্যতঃ (যথাযথরূপে কর্ম ও সাধন ফল অনুযায়ী) ব্যদধাৎ (বিধান করছেন)

সরল অর্থ- সেই পরব্রহ্ম আকাশের ন্যায় সর্বব্যাপী, দীপ্ত ও তিনি স্থূল শরীর বর্জিত বলে ব্যধি
ও বন্ধন রহিত তিনি নির্মল ও শুদ্ধ, পাপের লেশমাত্র নেই তিনি সর্বদ্রষ্টা, বুদ্ধির প্রেরক, সকলের শ্রেষ্ঠ ও সনাতন অনাদিকাল থেকে তিনি কর্ম অনুযায়ী জীবের ফল সাধন যথাযথরূপে বিধান করে থাকেন

                               অবিদ্যা-উপাসনার ফল

                 অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে৳বিদ্যামুপাসতে

              ততোভূয় ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতাঃ।।

অন্বয় যে (যারা) অবিদ্যাং (বিদ্যা বিরোধী অগ্নিহোত্রাদি) উপাসতে (অনুষ্ঠানে রত থাকে অর্থাৎ কর্মকে যারা চরম লক্ষ্য বলে মনে করে) [তাঁরা] অন্ধং তমঃ (অজ্ঞানাচ্ছন্ন অন্ধকারে) প্রবিশন্তি (প্রবেশ করে থাকে) যে উ (আর যারা) বিদ্যায়াং (কেবলমাত্র দেবতা উপাসনাতে অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধির পূর্বে কর্মত্যাগ করে) রতাঃ (নিযুক্ত থাকে) তে (তারা) ততঃ (পূর্বোক্ত শ্রেণির থেকে) ভূয় ইব তমঃ (আরও গভীরতর অন্ধকারে) [প্রবেশ করে]

সরল অর্থ = যারা অবিদ্যার উপাসনা করে, তারা অজ্ঞান অন্ধকারে প্রবেশ করে। অবিদ্যার অর্থ আত্মজ্ঞানের প্রতিকূল অগ্নিহোত্রদি কর্ম। এর ফলে আমি  আমার এই অভিমানরূপ অজ্ঞানে মুগ্ধ হয়। আর যারা কর্ম অনুষ্ঠান ত্যাগ করে কেবল বিদ্যায় ( দেবতা চিন্তায়) নিযুক্ত থাকে তারা পূর্বাপেক্ষা অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করে।

                       বিদ্যা ও অবিদ্যার ফল

                    অন্যদেবাহুর্বিদ্যয়া৳ন্যদাহুরবিদ্যয়া

                 ইতি শুশ্রুম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে।। ১০

অন্বয় যে (যাঁরা)  নঃ (আমাদের কাছে) তৎ (সেই বিদ্যা ও অবিদ্যার ফল) বিচচক্ষিরে (ব্যাখ্যা করেছেন) [সেই] ধীরাণাম্‌ (সুধীগণের কাছে) ইতি ( এই রকমই) শুশ্রুম (আমরা শুনেছি) বিদ্যয়া ( দেবদেবীর তত্ত্বমূলক জ্ঞান, উপাসনা) অন্যৎ এব (স্বর্গাদি প্রাপ্তিরূপ ভিন্ন ফল) [এবং] অবিদ্যয়া (নিছক কর্ম দ্বারা) অন্যৎ এব (অন্যরূপ প্রাপ্তি যেমন পিতৃলোকাদি প্রাপ্তি) [শাস্ত্রে] ইতি ( এই সিদ্ধান্ত) আহুঃ (বলা হয়েছে)।

সরল অর্থ ধীর ব্যক্তিগণ সম্প্রদায় পরম্পরা ক্রমে এই উপদেশ প্রদান করে আসছেন যে, কর্ম ও জ্ঞান উপাসনার ফল একেবারে বিভিন্ন দেবতা আরাধনার দ্বারা দেবলোক এবং কর্মানুষ্ঠানের দ্বারা পিতৃলোক লাভ হয়ে থাকে।

                       বিদ্যা ও অবিদ্যার সমুচ্চয় ফল

                   বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ

                অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্ত্বা বিদ্যয়া৳মৃতমশ্নুতে।। ১১

অন্বয় - যঃ (যিনি) বিদ্যাং (দেবতা উপাসনাদি) অবিদ্যাং চ ( এবং কর্মতত্ত্ব) তৎ উভয়ং সহ ( দেব উপাসনা ও কর্মাদির একত্র অনুষ্ঠান) বেদ (জানেন) [তিনি] অবিদ্যয়া (কর্মদ্বারা নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান দ্বারা) মৃত্যুং (সংসারকে) তীর্ত্বা (অতিক্রম করে) বিদ্যয়া (দেবতার উপাসনার দ্বারা) অমৃতং (উপাস্য দেবতার স্বরূপ বা ক্রমমুক্তি) অশ্নুতে লাভ করেন।

সরল অর্থ = যিনি বিদ্যাকে (দেবতা-জ্ঞানকে) ও অবিদ্যাকে (কর্মকে) একত্র অনুষ্ঠেয় বলে জানেন, তিনি অবিদ্যার দ্বারা বা কর্মানুষ্ঠানের দ্বারা জন্মমৃত্যুর প্রবাহ এই সংসার অতিক্রম করেন; এবং বিদ্যা বা উপাসনাদির দ্বারা দেবভাব লাভ করে থাকেন। অর্থাৎ দেবস্বরূপতা প্রাপ্ত হন।

                              অবিদ্যার নিন্দা

                   অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে৳সংভূতিমুপাসতে

               ততো ভূয় ইব তে তমো য উ সংভূত্যাং রতাঃ।। ১২

অন্বয় - যে (যারা) অসম্ভূতিং (অব্যক্তকে ) উপাসতে (উপাসনা করে) [তারা] অন্ধং তমঃ (গাঢ় অন্ধকারে) প্রবিশন্তি (প্রবেশ করে)। যে উ ( যারা আবার) সংভূত্যাং রতা (অভ্যুদয়শীল হিরণ্যগর্ভ বা ব্রহ্মাদি দেবতায় অনুরক্ত) তে (তারা) ততঃ ভূয়ঃ ইব ( তদপেক্ষাও অধিকতর) তমঃ (অজ্ঞান অন্ধকারে) [প্রবেশ করে থাকেন]

সরল অর্থ যারা অসম্ভূতির (প্রকৃতির) উপাসনা করে, তারা অজ্ঞানরূপ ঘোর অন্ধকারে প্রবেশ করে। আর যারা সম্ভূতির(হিরণ্যগর্ভাদির) উপাসনা করে, তারা অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করে।

                        কার্যব্রহ্ম ও প্রকৃতি উপাসনার ফল

                  অন্যদেবাহুঃ সংভবাদন্যদাহুরসংভবাৎ

                 ইতি শুশ্রুম ধীরাণাং যে ন স্তদ্বিচচক্ষিরে।।১৩

অন্বয় সংভবাৎ (হিরণ্যগর্ভ বা ব্রহ্মাদি দেবোপাসনার ফল) অন্যদের (ভিন্নই)অসম্ভবাৎ (অনাদি প্রকৃতির উপাসনাতে) অন্যৎ (অন্য প্রকার) আহুঃ (ধীর ব্যক্তিগণ বলেছেন)। যে ( যে ধীর ব্যক্তিগণ) নঃ (আমাদের কাছে) তৎ (এই সংভূতি ও অসংভূতির ফল) বিচচক্ষিরে (ব্যাখ্যা করেছেন) ধীরাণাং (ধীর ব্যক্তিগণের) ইতি (এই পূর্বোক্ত সিদ্ধান্ত) শুশ্রুম (আমরা শুনেছি)।

সরল অর্থ- জ্ঞানীরা বলেন হিরণ্যগর্ভাদির ভজনায় ফল পৃথক। প্রকৃতির উপাসনাতে ভিন্ন ফল আমরা যাঁদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছি, সেই সব ধীমান আচার্যগণের মুখেও তাই শুনেছি।

 

                     সংভূতি ও অসংভূতি সমুচ্চয় সাধন

                সংভূতিং চ বিনাশং চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ

               বিনাশেন মৃত্যুং তীর্ত্বা সংভূত্যামৃতমশ্নুতে।। ১৪

অন্বয়- যঃ (যে ব্যক্তি) সংভূতিং চ (কারণরূপ প্রকৃতি
) বিনাশং চ ( এবং কার্যরূপ হিরণ্যগর্ভকে) উভয়ং সহ (এক ব্যক্তি সম্পাদন করে বলে) বেদ (জানে) [সে] বিনাশেন (হিরণ্যগর্ভের উপাসনা দ্বারা) মৃত্যুং তীর্ত্বা (সংসারকে অতিক্রম করে) সংভূত্যা (অব্যক্ত প্রকৃতির উপাসনা দ্বারা) অমৃতং (দেবতাত্মভাব বা আপেক্ষিক অমরত্ব) অশ্নুতে (প্রাপ্ত হন)।

সরল অর্থ যিনি অব্যক্তকে(অসম্ভূতি) এবং ব্যক্তকে ( সম্ভূতি) একই সঙ্গে উপাসনা করেন তিনি অব্যক্তের উপাসনা দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করেন এবং ব্যক্তের উপাসনার দ্বারা মৃত্যুকে অতিক্রম করেন

                                  সূর্য-প্রার্থনা

                   হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখম্

                    তত্ত্বং পূষন্নপাবৃণু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।।১৫

অন্বয় হিরণ্ময়েন ( স্বর্ণের মত দীপ্তিশালী) পাত্রেন ( পাত্র দ্বারা) সত্যস্য (সত্যস্বরূপ ব্রহ্মের) মুখম্‌ ( উপলব্ধির মুখ্য দ্বার ) পিহিতম্‌ (আবৃত রয়েছে) পূষন্‌ ( হে সর্বলোক পোষক আদিত্য) ত্বং (তুমি) তৎ( সেই আবরণ) সত্যধর্মায় ( সত্যজ্ঞান লাভে ইচ্ছুক মুমুক্ষুর) দৃষ্টয়ে (অবগতির জন্য) অপাবৃণু ( সরিয়ে দাও)

সরল অর্থ সত্যের মুখ উজ্জ্বল সোনার পাত্রের দ্বারা আবৃত জীবন ও জগতের ধারক  হে সূর্য, তুমি সেই আবরণটি দয়া করে সরিয়ে দাও যার ফলে আমি সত্যকে দর্শন করতে পারি

                                   সূর্য-প্রার্থনা

                    পূষন্নেকর্ষে যম সূর্য প্রাজাপত্য ব্যূহ রশ্মীন্‌ সমূহ।

                তেজো যত্তে রূপং কল্যাণতমং তত্তে পশ্যামি

                     যো৳সাবসৌ পুরুষঃ সো৳হমস্মি।। ১৬

অন্বয় পূষন্‌ (  হে জগৎ পরিপোষক সূর্য), এক-ঋষে ( একাকী গমনশীল বা একমাত্র দ্রষ্টা) যম ( নিয়ন্তা) প্রাজাপত্য ( প্রজাপতির পুত্র) সূর্য ( রস, রশ্মি ও প্রাণকে যিনি গ্রহণ করেন) রশ্মীন্‌ (কিরণসমূহ) ব্যূহ (দূর কর), তেজঃ (জ্যোতি) সমূহ( সংবরণ কর), তে (তোমার) যৎ রূপং (যে রূপ) কল্যাণতমং (অতি সুশোভন) তৎ (তা) তে (তোমার কৃপায়) পশ্যামি (দর্শন করব)। যঃ (যিনি) অসৌ( আদিত্যমণ্ডলে) পুরুষঃ ( সূর্য মন্ডলের পুরুষ) সঃ অহম্‌ অস্মি ( সেই পুরুষ ও আমি এক)

সরল অর্থ - হে জগৎপোষক, একাকী বিচরণকারী, সর্ব নিয়ন্তা, প্রজাপতি সম্ভূত সূর্য, তোমার কিরণ সকল সংবরণ কর, তীব্র তেজ সংকোচিত কর। তোমার যা অতি মঙ্গলময় রূপ, তা দর্শন করি। এই যে আদিত্য মণ্ডলে অবস্থিত পুরুষ, তা থেকে আমি অভিন্ন।

                                অন্তিম প্রার্থনা                                                                                                        

                      বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরং

                ওঁ ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর  কৃতং   স্মর।।১৭

অন্বয় বায়ুঃ (প্রাণ বায়ু) অনিলং (সূত্রাত্মরূপ) অমৃতং (অধিদৈবাত্মকে) [প্রাপ্ত হোক] অথ (লিঙ্গদেহ ত্যাগের পর) ইদং শরীরম্‌ ( এই স্থূলদেহ) ভস্মান্তং (ভস্মাবশেষ ) [হোক] ওঁম্‌ ( হে অগ্নিরূপী আত্মন্‌) ক্রতো (হে সংকল্পাত্মক মন) কৃতং (শুভাশুভ সম্পাদিত কর্ম) স্মর (স্মরণ কর)।[ জোর দেওয়ার জন্য দুবার বলা হল]

 

সরল অর্থ অন্তিমকালে সাধক নিজের কর্তব্য স্মরণ করছেন। তিনি বলছেন আমার প্রাণবায়ু অমৃতস্ব                                                                                                                                                         স্বরূপ অনিলকে প্রাপ্ত হোক। আমার এই স্থূল দেহ অগ্নিতে ভস্মীভূত হোক। হে মন, এতকাল যে সব শুভাশুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেছ তা স্মরণ করার সময় উপস্থিত। অতএব প্রণব স্বরূপ ব্রহ্মে নিবিষ্ট হয়ে তা স্মরণ কর।

                                 অগ্নিদেবতার প্রার্থনা

                অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অস্মান্বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান্‌।

                যুযোধ্যস্মজুহুরাণমেনো ভূয়িষ্ঠাং তে নমউক্তিং বিধেম।।১৮

অন্বয় দেব অগ্নে ( হে অগ্নির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা) বিশ্বানি ( সমস্ত ) বয়ুনানি ( কর্ম সমূহ) বিদ্বান্‌ ( জেনে) অস্মান্‌ (আমাদেরকে) রায়ে (ধন অর্থাৎ কর্মফল ভোগের নিমিত্ত) সুপথা ( শোভন বা শুক্ল উত্তরায়ণ মার্গে) নয় (নিয়ে চল)অস্মৎ ( আমাদের থেকে) জুহুরাণম্‌ (এ পথের প্রতিবন্ধক) এনঃ (পাপকে) যুযোধি ( দূর করে দাও) তে (তোমাকে) ভূয়িষ্ঠাং (বার বার) নম উক্তিং (নমস্কার বচন) বিধেম (নিবেদন করছি)।

সরল অর্থ হে অগ্নিদেবতা! তুমি আমাদেরকে সুপথে নিয়ে চল। তুমি আমাদের সমস্ত কর্মই জানআমাদের অপকারী পাপ সকল দূর করে দাও। আমি বার বার তোমাকে সবিনয়ে নমস্কার করছি।

 

====================()====================

Comments

  1. 🙏সুন্দর সেই পবিত্র ইশোপনিষদ্ 🙏
    🙏মহারাজ, আপনি আমাদের জীবনে 'মঙ্গল প্রদীপ'! -নিত্য নিরন্তর আধ্যাত্মিক আলোকিত পবিত্র জীবন দান করে চলেছেন। ধন্য মহামানব জীবন!! সবসময় সুস্থ থাকুন,খুব ভালো থাকুন আপনি। সশ্রদ্ধ ভক্তি চিত্তে শত সহস্র বিনম্র প্রণাম মহারাজ।
    🙏🙏🙏🕉️ শান্তি:🕉️🙏🙏🙏
    ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

    ReplyDelete
  2. Khub valo lagchhe, puro akhono bujhte pare ne ,bujhte chesta korchhe, jeta bujhte na parbo, apne achhen amader sathe asima batabyal

    ReplyDelete
  3. খুব ভালো লাগলো মহারাজ 🙏🙏 আবার ঈশপণিষদ ক্লাসের দিন গুলো মনে পড়লো।বার বার পড়তে হবে।আত্মোজ্ঞ্যান লাভের জন্য 🙏🙏🙏
    জয় ঠাকুর মা স্বামীজি জয় মহারাজ 🙏🙏 ভালো থাকবেন 🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  4. Atmajyoti peye khub bhalo lagche

    ReplyDelete

Post a Comment