কঠোপনিষদ
For online class
অনুবাদঃ স্বামী হরিময়ানন্দ
“সেই অপূর্ব কঠোপনিষদের কথা ধর। এই কাব্যটি
কি অপূর্ব ও সর্বাঙ্গ সুন্দর!...ইহার আরম্ভই অপূর্ব! সেই বালক নচিকেতার হৃদয়ে শ্রদ্ধার
অবির্ভাব, তাহার
যমপুরীতে যাইবার ইচ্ছা, আর সেই আশ্চর্য
তত্ত্ববক্তা স্বয়ং যম তাহাকে জন্ম-মৃত্যুরহস্যের উপদেশ দিতেছেন! আর বালক তাঁহার নিকট কি জানিতে চাহিতেছে? – মৃত্যুরহস্য”। --স্বামী বিবেকানন্দ/বার/৬/২২৮
“উপনিষদের মধ্যে এমন সুন্দর গ্রন্থ
আর দেখা যায় না। ইচ্ছা হয় তোরা এখানা কণ্ঠে করে রাখিস। নচিকেতার মতো শ্রদ্ধা সাহস
বিচার ও বৈরাগ্য জীবনে আনবার চেষ্টা কর”। ---স্বামী বিবেকানন্দ /বা র/৯/৭
[উপনিষদ হল ব্রহ্মবিদ্যা। এই বিদ্যাই সংসার-সাগরের
উত্তাল তরঙ্গ থেকে উদ্ধারের একমাত্র তরণী। ত্রিতাপ তাপিত মানব-হৃদয়ের শান্তি
প্রদানকারী মহৌষধি। যাদের পরলোকে বিশ্বাস নেই, আত্মার নিত্যত্বে শ্রদ্ধা নেই, যারা
কেবল দেহ পরিচালন ও পরিপোষণে তৎপর, তাদের কাছে এই জ্ঞান অন্ধের আয়নাতে মুখ দেখার মতো
নিষ্ফল হয়। তাই লোক কল্যাণকারী শ্রুতিমাতা আমাদের মোহ দৃষ্টি দূর করার জন্য সুন্দর
আধ্যায়িকার মাধ্যমে ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশ দান করছেন।
এখানে ঋষিকুমার নচিকেতা হলেন প্রশ্নকর্তা। স্বয়ং যমরাজ হলেন উত্তরদাতা। প্রধান
প্রশ্ন হল মৃত্যুর পর স্থূল দেহ বিনষ্ট হয়ে গেলে আত্মার অস্তিত্ব থাকে কিনা?
এক সময় নচিকেতার পিতা বাজশ্রবস ঋষি বিশ্বজিৎ নামক যজ্ঞ করেছিলেন। যজ্ঞের শেষে
উপযুক্ত দক্ষিণা দান না করলে, সমুচিত ফল লাভ হয় না। তখনকার দিনে দক্ষিণা হিসাবে
গো-দান খুব প্রসিদ্ধ ছিল। দক্ষিণার জন্য পিতা কতকগুলি বৃদ্ধ গাভী দান করতে
প্রস্তুত হলে সরল বালক নতিকেতার মনে বেদনার উপস্থিত হয়। শীর্ণ ও মৃতপ্রায় গাভী দান
করে পিতা ধর্মের বদলে অধর্ম করছেন। এর ফলে দুঃখময় নরকের দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে। আমি
পুত্র প্রাণ দিয়েও পিতার উপকার করা আমার কর্তব্য। এই ভেবে নচিকেতা পিতার সামনে এসে
জিজ্ঞাসা করতে লাগল, আমিও আপনার একটি সম্পত্তি, তাই আমাকে আপনি কার উদ্দেশে প্রদান
করবেন। নচিকেতা বার বার এক কথা জিজ্ঞাসা করায় পিতা রেগে গিয়ে বললেন, ‘তোকে যমের উদ্দেশে দান করলাম’।
বালক নচিকেতা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে পিতার আদেশে যমালয়ে উপস্থিত হলেন।
যমরাজ তখন ছিলেন না। তাই নচিকেতা তিন রাত অনাহারে যমের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যম
ফিরে এলে নচিকেতার সঙ্গে আলাপ হয়। যেহেতু ব্রাহ্মণ পুত্র অনাহারে তিনরাত অপেক্ষা
করেছিলেন। তাই যম তাঁকে তিনটি বর দান করতে চেয়েছেন। এই বর দানে নচিকেতা আত্মজ্ঞান
লাভ করতে চেয়েছেন। মোটামুটি এই হল উপাখ্যান। ]
কৃষ্ণযজুর্বেদীয়
শান্তি পাঠ
ওঁ সহ নাববতু সহ নৌ ভুনক্তু, সহ
বীর্যং করবাবহৈ।
তেজস্বি নাবধীতমস্তু, মা
বিদ্বিষাবহৈ।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
সরলার্থ- পরমাত্মা আমাদের গুরু ও শিষ্য উভয়কে সমভাবে তুল্যভাবে
বিদ্যাফল দান করুন, আমারা যেন
সমভাবে সামর্থ্য অর্জন করতে পারি, আমাদের উভয়েরই বিদ্যা সফল হোক।
আমরা যেন পরস্পরকে বিদ্বেষ না করি।
1
প্রথম অধ্যায়
প্রথম বল্লী
ওঁ উশন্ হ বৈ বাজশ্রবসঃ সর্ববেদসং দদৌ।
তস্য হ নচিকেতা নাম পুত্র আস।। ১
শব্দার্থ- ওঁ – পবিত্র ওঁকার, উশন্- যজ্ঞফল কামনা করে, হ বৈ – অতীত ঘটনা স্মরণ করার শব্দদ্বয়,বাজশ্রবসঃ- বাজশ্রবার পুত্র, উদ্দালক, সর্ববেদসম্ – সর্বস্ব ,দদৌ- দান করেছিলেন, তস্য – বাজশ্রবের, হ- এই রকম শো
না যায়, নচিকেতাঃ- নচিকেতা নামক, পুত্র- পুত্র, আস- ছিলেন।
সরলার্থ-
বাজশ্রবার পুত্র ঋষি বাজশ্রবস(উদ্দালক) ‘বিশ্বজিৎ’-নামক যজ্ঞ করে তার স্বর্গলাভ কামনায় সর্বস্ব দান করেছিলেন।
তং হ কুমারং সন্তং দক্ষিণাসু নীয়মানাসু
শ্রদ্ধাবিবেশ, সো৳মন্যত।। ২
শব্দার্থ- তম্ হ – সে নচিকেতার হৃদয়ে, কুমারম্ সন্তম্- অল্পবয়স্ক
বালক, দক্ষিণাসু- পুরোহিতদের দক্ষিণা দেবার জন্য, নীয়মানাসু – গাভিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, শ্রদ্ধা –আস্তিক্য বুদ্ধি, আবিবেশ- উৎপন্ন হল, সঃ –তিনি ,অমন্যত- বিচার করতে লাগলেন।
সরলার্থ- পিতা যজ্ঞের দক্ষিণা হিসাবে জরাজীর্ণ গাভিগুলি
ব্রাহ্মণকে দান করতে উদ্যত হচ্ছেন, এমন সময় সে বালক নচিকেতার হৃদয়ে শ্রদ্ধার উদ্রেক হল। তিনি মনে
মনে ভাবতে লাগলেন।
পীতোদকা জগ্ধতৃণা দুগ্ধদোহা নিরিন্দ্রিয়াঃ
অনন্দা নাম তে লোকাস্তান্ স গচ্ছতি তা দদৎ।।৩
শব্দার্থ- পীতোদকাঃ- শেষবারের মতো যারা জলপান করেছে, জগ্ধতৃণাঃ – যারা জন্মের মতো ঘাস খেয়েছে, দুগ্ধদোহাঃ – যাদের দুধ শেষবারের মতো দোহা হয়েছে, নিরিন্দ্রিয়া- যাদের ইন্দ্রিয় লুপ্তপ্রায়, তাঃ – এমন মরণাপন্ন গাভিগুলির, দদৎ - দানকারী, সঃ- সেই দানকর্তা, অনন্দা –নিরানন্দ, তে লোকাঃ –সেই লোকসমূহ, নাম-খ্যাত, তান্- সেই সকল লোকে, গচ্ছতি – গমন করেন।
অনুবাদ- যে সব গাভী জন্মের মত জল পান করেছে, ঘাস খেয়েছে,
দুধ দিয়েছে এবং যারা সন্তান প্রসবে অসমর্থ, যে ব্যক্তি এমন গো-দান করেন সে দুঃখময়
প্রসিদ্ধ লোকে গমন করে।
স হোবাচ পিতরং, তত কস্মৈ মাং দাস্যসীতি।
দ্বিতীয়ং তৃতীয়ং, তং হোবাচ মৃত্যবে ত্বা দদামীতি।।৪
শব্দার্থ- সঃ হ – সে নচিকেতা, উবাচ- বললেন, পিতরম্ - পিতাকে, তত (তাত) –হে পিতা, কস্মৈ- কাকে, দাস্যসি ইতি=-
দান করবেন, দ্বিতীয়ম্ - দ্বিতীয়বার, তৃতীয়ম্- তৃতীয়বার বললেন, তম্ হ উবাচ- তখন পিতা তাকে বলল, ত্বা – তোমাকে, মৃত্যবে-
মৃত্যুকে যমরাজকে, দদামি ইতি – দান করছি।
সরলার্থ-
নচিকেতা পিতাকে বললেন, ‘বাবা, আমাকে কার নিকট অর্পণ করবেন?’
দ্বিতীয়
ও তৃতীয়বার একই প্রশ্ন করলেন। পিতা বিরক্ত হয়ে বললেন – তোমাকে যমের উদ্দেশে দান করলাম।
বহূনামেমি প্রথমো বহূনামেমি মধ্যমঃ।
কিং স্বিদ্ যমস্য কর্তব্যং যন্ময়া৳দ্য করিষ্যতি।।৫
শব্দার্থ- বহুনাম্ - বহু শিষ্যের মধ্যে আমি, প্রথমঃ – প্রথম শ্রেণীর যোগ্য আচরণ, এমি- করে এসেছি, বহূনাম্-
অনেকের মধ্যে, মধ্যমঃ – মধ্যম শ্রেণীর
যোগ্য আচরণ, এমি করে এসেছি, যমস্য- যমের,
কিম্ স্বিৎ কর্তব্যম্- এমন কি প্রয়োজন, যৎ অদ্য – যা আজ, ময়া- আমার দ্বারা, করিষ্যতি- সাধন করিবেন।
সরলার্থ-
নচিকেতা মনে মনে ভাবলেন, অনেকের মধ্যে আমি প্রথম এবং অনেকের মধ্যে আমি মধ্যম।
কিন্তু অধম কখনো নই সুতরাং যমের এমন কী প্রয়োজন আছে আমার দ্বারা পিতা তা করাতে
চান?
সম্বন্ধ সূত্রঃ পিতা হয়তো রাগের বশে বলে ফেলেছেন
তোমায় যমকে দিলাম। কিন্তু যাই হোক পিতার কথার অমর্যাদা যাতে না হয় তা দেখতে হবে।
আবার এদিকে পিতা মনস্তাপে ভুগছেন। তাই পিতাকে সান্ত্বনা দেওয়াও তার কর্তব্য। এই সব
ভাবতে ভাবতে নচিকেতা পিতাকে আশ্বাস দিচ্ছেন --
এক্সঅনুপশ্য যথা পূর্বে প্রতিপশ্য তথা৳পরে।
সস্যমিব
মর্ত্যঃ পচ্যতে সস্যমিবাজায়তে পুনঃ।। ৬
শব্দার্থ- অনুপশ্য- তার উপর বিচার করুন, যথা- যেরূপ
আচরণ করতেন, অপরে- বর্তমানেও অন্য শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, তথা প্রতিপশ্য- সেগুলির উপর
নজর দিন ও আপনার কর্তব্য স্থির করুন, মর্ত্যঃ – এই মরণশীল মানুষ, সস্যম্ ইব – শস্যের মত, পুনঃ – আবার, আজায়তে – উৎপন্ন হয়।
সরলার্থ- সত্যে প্রতিষ্ঠিত থাকবার জন্য নচিকেতা পিতাকে
বললেন – বাবা,
পূর্ববর্তী পিতৃপিতামহগণ ও বর্তমান সাধুগণের সত্যনিষ্ঠার বিষয় উত্তমরূপে আলোচনা
করুন। মানুষ শস্যের ন্যায় জীর্ণ হয়ে মরে এবং শস্যেরই ন্যায় পুনুরায় জন্মে।
সুতরাং সত্য রক্ষা করে আমায় যমলোকে প্রেরণ
করুন।
সম্বন্ধ সূত্রঃ এই অনিত্য জীবনের জন্য কোনদিন কর্তব্য
ত্যাগ করে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। পিতা, আপনি কোন দুঃখ করবেন না, আমাকে যমের
নিকট গমনের অনুমতি দিন। অন্তরে দুঃখ পেলেও উদ্দালক নচিকেতার সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা
দেখে অনুমতি দিলেন।
নচিকেতা যখন যমালয়ে যান তখন যমরাজ উপস্থিত ছিলেন না।
যমরাজের আগমন প্রতীক্ষায় নচিকেতা তিন দিন
তিন রাত অন্নজল গ্রহণ না করে ছিলেন। যমরাজ ফিরে এলে তাঁর লোকের বললেন -----
বৈশ্বানরঃ প্রবিশপত্যতিথিব্রাহ্মণো গৃহান্।
তস্যৈতাং শান্তিং কুর্বন্তি হর বৈবস্বতোদকম্।।৭
শব্দার্থ- বৈবস্বত- হে সূর্যপুত্র, বৈশ্বানরঃ-
অগ্নিদেব, ব্রাহ্মণঃ অতিথিঃ – ব্রাহ্মণ
অতিথি রূপে, গৃহান্ - গৃহস্থের ঘরে, প্রবিশতি- প্রবেশ করেন, তস্য – তার, এতাম্ - এইরূপ ( পাদ্য, অর্ঘ্য, আসন ইত্যাদি
দিয়ে, শান্তিম্ -শান্তি দান, কুর্বন্তি- করে থাকেন, উদকম্ হর – তাঁর পা হাত ধোয়ার জল নিয়ে যান।
সরলার্থ- যমালয়ে তিন দিন উপবাসে অপেক্ষা
করার পর, যম ফিরলে তাঁর মন্ত্রীরা তাঁকে
বললেন – ব্রাহ্মণ অতিথি যেন অগ্নিরূপে গৃহে প্রবেশ করেন। সুতরাং হে যমরাজ, তাঁর পা ধোয়ার জল ইত্যাদির
ব্যবস্থা করুন।
3
আশা-প্রতীক্ষে সঙ্গতং সুনৃতাং
চেষ্টাপূর্তে পুত্রপশূংশ্চ সর্বান্।
এতদ্বৃঙ্তে পুরুষস্যাল্পমেধসাম্
যস্যানশ্নন্ বসতি ব্রাহ্মণো গৃহে।।৮
শব্দার্থ- যস্য –যার, গৃহে –ঘরে, ব্রাহ্মণঃ –ব্রাহ্মণ অতিথি,
অনশ্নন্- না খেয়ে, বসতি- অবস্থান করে, তস্য –সেই, অল্পমেধসঃ- অল্পবুদ্ধি, পুরুষস্য- মানুষের, আশা – অপরিচিত বস্তু প্রাপ্তির ইচ্ছা, প্রতীক্ষা- পরিচিত বস্তুর অপেক্ষা, সঙ্গতম্- সাধু-সঙ্গের ফল, সুনৃতাম্ চ – প্রিয় বাক্য
ব্যবহারের ফল, ইষ্টা-পূর্তে – যাগযজ্ঞ ও উদ্যানাদি দানের ফল, সর্বান্ – সমস্ত, পুত্রপশূন্- পুত্র ও গৃহপালিত
পশু, বৃঙ্ক্তে – বিনাশ করে।
সরলার্থ- যার গৃহে ব্রাহ্মণ অনাহারে বাস করেন, সেই অল্পবুদ্ধি মানুষের আশা(অজানা
বস্তুর প্রাপ্তির বাসনা) প্রতীক্ষা( জানা বস্তুর প্রাপ্তির ইচ্ছা), সাধুসঙ্গের ফল,
প্রিয়বাক্য প্রয়োগের ফল, যাগের ফল, সাধারণের জন্য কূপতড়াগাদি দানের ফল, পুত্র ও পশু – এই সমস্তই অতিথির উপবাসের ফলে
বিনষ্ট হয়।
সম্বন্ধ সূত্রঃ অতি সত্ত্বর যমরাজ নচিকেতার কাছে
গেলেন ও পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা করে বললেন -
তিস্রো রাত্রীর্যদবাৎসীর্গৃহে মে৳নশ্নন্
ব্রহ্মন্নতিথির্ন্মস্যঃ
নমস্তে৳স্তু ব্রহ্মন্ স্বস্তি মে৳স্তু
তস্মাৎ প্রতি ত্রীন্ বরান্ বৃণীষ্ব।৯
শব্দার্থ-ব্রহ্মন্ – হে ব্রাহ্মণ, নমস্যঃ অতিথিঃ –প্রণম্য অতিথি, তে- তোমাকে, নমঃ অস্তু –নমস্কার করি,ব্রহ্মন্ – হে ব্রাহ্মণ, মে স্বস্তি- আমার কল্যাণ, অস্তু – হোক, যৎ -যে, তিস্রঃ রাত্রীঃ – তিন রাত্রী, মে- আমার,গৃহে – ঘরে, অনশ্নন্- অনাহারে, অবাৎসীঃ – বাস করেছ, তস্মাৎ - সেজন্য, প্রতি- প্রত্যেক রাত্রির
জন্য, ত্রীন্ বরান্ - তিনটি বর, বৃণীষ্ব- প্রার্থনা কর।
সরলার্থ- যমরাজ নচিকেতাকে যথাযথ অভ্যর্থনা
করে বললেন – হে ব্রাহ্মণ, তুমি অতিথি ও
আমার নমস্য, অথচ তিন রাত্রি আমার গৃহে অনাহারে
বাস করছ। সে জন্য তোমায় নমস্কার করছি, আমার মঙ্গল হোক, আর প্রতি রাতের জন্য একটি করে তিনটি বর প্রার্থনা কর।
সম্বন্ধ সূত্র ঃ ব্রাহ্মণ বালকের অনশনে যমরাজ ভীত হয়ে বরদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্রথমে নচিকেতার পিতার কথা
মনে পড়ল, তাই পিতাকে
সুখী করার ইচ্ছায় যমরাজকে বললেন।
শান্তসঙ্কল্পঃ সুমনা যথা স্যাদ্
বীতমন্যুর্গৌতমো মা৳ভি মৃত্যো।
ত্বৎপ্রসৃষ্টং মা৳ভিবদেৎ প্রতীত
এতৎ ত্রয়াণাং প্রথমং বরং বৃণে।।১০
শব্দার্থ- মৃত্যো – হে মৃত্যুর দেবতা
যমরাজ, যথা – যাতে, গৌতমঃ –গৌতম বংশীয় উদ্দালক, মা অভি – আমার প্রতি,
শান্ত-সংকল্পঃ – মানসিক
প্রশান্তিযুক্ত, সুমনাঃ –প্রসন্ন চিত্ত,বীত-মন্যুঃ – রাগ এবং দ্বেষহীন, স্যাৎ - হন, ত্বৎ-প্রসৃষ্টম্ - আপনার কাছ থেকে তাঁর কাছে
ফিরে যাবার পর, মা প্রতীতঃ – আমার প্রতি বিশ্বাস যুক্ত হৃদয়ে, অভিবদেৎ - আমার প্রতি প্রীতিপূর্ণ কথা বলেন। এতৎ - এই, ত্রয়াণাম্ -
তিনটির মধ্যে, প্রথমম্ বরম্ - প্রথম বর, বৃণে- প্রার্থনা করি।।
সরলার্থ-নচিকেতা বললেন – হে যমরাজ, তিনটি বরের মধ্যে আমি প্রথম এই বর
চাই যে, আমার পিতা গৌতমের যেন আমার
সম্বন্ধে সকল দুশ্চিন্তা চলে যায়, তিনি যেন রাগ না করেন।
4
যথা পুরস্তাদ্ভবিতা প্রতীত
ঔদ্দালকিবারুণির্মৎপ্রসৃষ্টঃ।
সুখং রাত্রীঃ শয়িতা বীতমন্যু
স্ত্বাং দদৃশিবান্ মৃত্যুমুখাৎ প্রমুক্তম্।। ১১
শব্দার্থ- ত্বাম্ - তোমার, মৃত্যুমুখাৎ -মৃত্যুর মুখ
থেকে, প্রমুক্তম্ - মুক্ত, দদৃশিবান্ -দেখে, মৎপ্রসৃষ্টঃ – আমার প্রেরণায়, আরুণিঃ – তোমার পিতা, ঔদ্দালকিঃ- উদ্দালক, যথা পুরস্তাৎ -
আগের মত, প্রতীতঃ – বিশ্বাসী, বীতমন্যু – ক্রোধ ও দুঃখহীন, ভবিতা – হবেন, রাত্রীঃ – রাত্রি সমূহে, সুখম্ - সুখে, শয়িতা – নিদ্রা যাবেন।
সরলার্থ- যম বললেন – আরুণি উদ্দালক পূর্বে তোমার প্রতি
যেমন স্নেহ পরায়ণ ছিলেন, তোমায় চিনতে পেরে ভবিষ্যতে তেমন স্নেহশীল হবেন। মৃত্যুমুখ
থেকে ফিরে যাচ্ছ দেখেও তিনি ক্রোধ করবেন না। এবং এরপর বহুরাত্রি সুখে নিদ্রা যাবেন।
স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চনাস্তি
ন তত্র ত্বং ন জরয়া বিভেতি।
উভে তীর্ত্বা-অশনায়া-পিপাসে
শোকাতিগো মোদতে স্বর্গলোকে।।১২
শব্দার্থ- স্বর্গে লোকে – স্ব্বর্গলোকে, কিঞ্চন্ ভয়ম্ - কোনো প্রকার ভয়, ন
অস্তি- নেই তত্র ত্বম্ ন – সেখানে মৃত্যুরূপ আপনিও নেই অর্থাৎ স্বর্গে মৃত্যু
নেই, জরয়া ন বিভেতি- জরার ভয় নেই, স্বর্গলোকে –স্বর্গ লোকে, অশনায়াপিপাসে – ক্ষুধা ও পিপাসা,
উভে তীর্ত্বা – এই দুই থেকে মুক্ত
হয়ে, শোকাতীগঃ – শোক-দুঃখের অতীত হবে, মোদতে – আনন্দ উপভোগ করে।।
সরলার্থ- নচিকেতা বললেন – স্বর্গলোকে কোন ভয় নেই। সেখানে
যেহেতু আপনি প্রভুত্ব করেন না, মর্ত্যবাসীর মতো কেউ সেখানে জরাগ্রস্ত হওয়ার ভয় পান
না। স্বর্গধামে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা উভয়কে অতিক্রম করে দুঃখাতীত হন ও আনন্দ অনুভব
করেন।
স ত্বমগ্নিং স্বর্গ্যম্-অধ্যেষি মৃত্যো
প্রব্রূহি ত্বং শ্রদ্দধানায় মহ্যম্
স্বর্গলোকে অমৃতত্বং ভজন্ত
এতদ্ দ্বিতীয়েন বৃণে বরেণ।।১৩
শব্দার্থ- মৃত্যো – হে মৃত্যুদেব, সঃ ত্বম্ - সে আপনি, স্বর্গ্যম্
অগ্নিম্ - স্বর্গ প্রাপ্তির সাধনরূপ অগ্নিকে, অধ্যেষি- জানেন, ত্বম্ - আপনি,
মহ্যম্ - আমাকে, শ্রদ্দধানায় – শ্রদ্ধাবানকে,
প্রব্রুহি- অগ্নিবিদ্যার কথা যথার্থরূপে বলুন, দ্বিতীয়েন বরেণ – দ্বিতীয় বরে এতৎ- এই অগ্নিবিদ্যা, বৃণে – প্রার্থনা করি।
সরলার্থ- হে যমরাজ, স্বর্গকামী যজমানগণ যে অগ্নিবিদ্যা
দ্বারা অমরত্ব প্রাপ্ত হন, আপনি তা জানেন, সুতরাং শ্রদ্ধাযুক্ত আমাকে তা বলুন – আমি দ্বিতীয় বরে এই প্রার্থনা
করি।
সম্বন্ধ সূত্র ঃ নচিকেতার দ্বিতীয় বর প্রার্থনায়
অঘ্নিবিদ্যার কথা শুনে যমরাজ অগ্নিবিদ্যার গোপনীয়তা সম্বন্ধে বললেন –
5
প্র তে ব্রবীমি তদু মে নিবোধ
স্বর্গ্যমগ্নিং নচিকেতঃ প্রজানন্।
অনন্তলোকাপ্তিমথো প্রতিষ্ঠাং
বিদ্ধি ত্বমেতং নিহিতং গুহায়াম্।।১৪
শব্দার্থ- যম বললেন – নচিকেতঃ –হে নচিকেতা, স্বর্গ্যম্ অগ্নিম্- স্বর্গলাভের উপায়ভূত অগ্নি, প্রজানন্ -
বিশেষভাবে জেনে, তে – তোমার, প্রব্রবীমি-
সবিশেষ বলছি, তৎ উ মে নিবোধ – তা তুমি
ভালোভাবে আমার কাছে জেনে নাও, ত্বম্ এতম্ - তুমি এই অগ্নিবিদ্যাকে,
অনন্ত-লোক-আপ্তিম্ - স্বর্গলোক প্রাপ্তির উপায়রূপ, অথো – আর, প্রতিষ্ঠাম্ - জগতের আশ্রয়, গুহায়াম্ নিহিতম্
- বুদ্ধিরূপ গুহায় অবস্থিত,বিদ্ধি – জানবে।
সরলার্থ- যম বললেন- হে নচিকেতা, আমি স্বর্গলাভের সাধন
অগ্নিকে উত্তমরূপে জানি এবং তোমায় তা বলছি। তুমি একাগ্র মনে তা শ্রবণ কর। তুমি
জেনো এই অগ্নিই স্বর্গলোক প্রপ্তির উপায়, সর্ব জগতের আশ্রয়, ইনি সর্বপ্রাণীর
হৃদয়গুহায় বাস করছেন।
লোকাদিমগ্নিং তমুবাচ তস্মৈ
যা ইষ্টকা যাবতীর্বা যথা বা।
স চাপি তৎ প্রত্যবদদ্ যথোক্ত-
মথাস্য মৃত্যুঃ পুনরেবাহ তুষ্টাঃ।১৫
শব্দার্থ- তস্মৈ – নচিকেতাকে, লোক-আদিম্ - সেই স্বর্গলোগের
কারণস্বরূপ, অগ্নিম্- অগ্নিবিদ্যা, উবাচ – বললেন, যাঃ – যেরূপ, যাবতীঃ বা – বা যত সংখ্যক, ইষ্টকাঃ – ইষ্টক সমূহ,( যজ্ঞের বেদীর জন্য ইষ্টক) যথা বা – এবং যে প্রকারে। সঃ চ অপি- এবং নচিকেতাও, তৎ -
মৃত্যুপ্রোক্ত সমস্ত বিষয়, যথা-উক্তম্ - যথাযথরূপে, প্রতি-অবদৎ - পুনরায় সেইভাবে
বললেন, অথ – তারপর, মৃত্যুঃ তস্য তুষ্টঃ – মৃত্যুদেব তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়ে, পুনঃ এব আহ – পুনরায় বললেন।
সরলার্থ-
যমরাজ নচিকেতাকে জগতের কারণ প্রসিদ্ধ অগ্নি তত্ত্ব উপদেশ দিলেন, ইষ্টকের স্বরূপ,
সংখ্যা পরিমাণ ও অগ্নিচয়ণের প্রণালী সমস্তই নচিকেতাকে বললেন। নচিকেতাও মৃত্যুর
সমস্ত কথা যথাযথ আবৃত্তি করলেন। এরপর যম নচিকেতার উপর সন্তুষ্ট হয়ে আবার বলতে
লাগলেন।
তমব্রবীৎ প্রীয়মাণো মহাত্মা
বরং তবেহাদ্য দদামি ভূয়ঃ।
তবৈব নাম্না ভবিতা৳য়মগ্নিঃ
সৃঙ্কাং চেমামনেকরূপাং গৃহাণ।। ১৬
শব্দার্থ- প্রীয়মাণঃ – নচিকেতার অসাধারণ বুদ্ধি দেখে প্রীত হয়ে, মহাত্মা-
মহাত্মা যমরাজ, তম্ - তাঁকে, অব্রবীৎ - বললেন, অদ্য – এখন, তব – তোমাকে, ইহ – এখানে, ভূয়ঃ বরম্ - পুনরায় এই বর (অতিরিক্ত), দদামি
– দিচ্ছি, অয়ম্ অগ্নিঃ –এই অগ্নিবিদ্যা, তব এব নাম্না, তোমারই নামে, ভবিতা – প্রসিদ্ধ হবে, চ ইমাম্ -এবং এই, অনেক রূপাম্
সৃঙ্কাম্ - বহু বিচিত্র মণি-মাণিক্যযুক্ত রত্নহার, গৃহাণ – গ্রহণ কর।
সরলার্থ- মহাত্মা
যমরাজ নচিকেতাকে উপযুক্ত শিষ্য বিবেচনা করে প্রীতি সহকারে বলতে লাগলেন- এই প্রীতির
জন্য তোমাকে আর একটি বর( চতুর্থ) দান করছি। এই অগ্নি তোমার নামে প্রসিদ্ধ হবে।
তুমি শব্দময় বহুরত্নখচিত এই মালা গ্রহণ কর। অথবা উত্তম কর্ম-বিদ্যা বিষয়ে উপদেশ
গ্রহণ কর।
সম্বন্ধ সূত্র - যমরাজ এবার নাচিকেত-অগ্নির ফল বিষয়ে
বর্ণনা করছেন।
6
ত্রিণাচিকেতস্ত্রিভিরেত্য সন্ধিং
ত্রিকর্মকৃৎ তরতি জন্মমৃত্যু।
ব্রহ্মজজ্ঞং দেবমীড্যং বিদিত্বা
নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি।১৭
শব্দার্থ- ত্রিভিঃ – মাতা, পিতা ও আচার্যের সঙ্গে, সন্ধিম্ -সম্বন্ধ,
এত্য- প্রাপ্ত হয়ে, ত্রিণাচিকেতঃ – যিনি তিনবার
নাচিকেত অগ্নি চয়ন করেন, ত্রি-কর্ম-কৃৎ- যজ্ঞ, দান ও বেদ অধ্যয়ন, জন্ম-মৃত্যু তরতি
– জন্ম মৃত্যুর হাত থেকে পরিত্রাণ লাভ করে,
ব্রহ্ম-জজ্ঞম্- ব্রহ্মা থেকে উৎপন্ন জগতের
জ্ঞাতা, ঈড্যম্ দেবম্ - স্তবনীয় অগ্নিদেবকে, বিদিত্বা – জেনে, নিচায্য – নিষ্কামভাবে অগ্নিচয়ন করে, ইমাম্ -এই, শান্তিম্-
শান্তি, অত্যন্তম্ -অত্যন্ত, এতি- প্রাপ্ত হন।
সরলার্থ- মাতা, পিতা ও আচার্য এই তিনের উপদেশ প্রাপ্ত হয়ে
যিনি তিনবার নাচিকেত অগ্নির চয়ন বা অর্চনা করেন অথবা ত্রিকর্ম – যজ্ঞ, দান ও বেদধ্যয়ন করেন তিনি
জন্ম-মৃত্যু অতিক্রম করেন। তিনি শাস্ত্র সহায়ে সর্বজ্ঞ, পূজনীয় ও স্বপ্রকাশ এই
অগ্নিদেবকে অবগত হয়ে শান্তি লাভ করেন।
ত্রিণাচিকেতস্ত্রয়মেতদ্ বিদিত্বা
য এবং বিদ্বাংশ্চিনুতে নাচিকেতম্।
স মৃত্যুপাশান্ পুরতঃ প্রণোদ্য
শোকাতিগো মোদতে স্বর্গলোকে।। ১৮
শব্দার্থ- যঃ – যিনি, এতৎ -এই ত্রয়ম্ - ইষ্টকের স্বরূপ, সংখ্যা ও অগ্নিচয়নবিধি, বিদিত্বা – জেনে, ত্রিনাচিকেতঃ-তিনবার নাচিকেত অগ্নির সেবা
করেছেন, এবম্- এইরূপে, বিদ্বান্ - জ্ঞাতা ব্যক্তি, নাচিকেতম্ - এই
নাচিকেত-অগ্নি, চিনুতে – চয়ন করেন, সঃ
মৃত্যুপাশান্ - তিনি মৃত্যুপাশকে, পুরতঃ – শরীর ত্যাগের পূর্বে, প্রণোদ্য- দূর করে, শোক-অতি-গঃ –শোককে অতিক্রম করে, স্বর্গলোকে – বৈরাজধামে বিরাটের সংগে আত্মভাব প্রাপ্ত হয়ে, মোদতে-
আনন্দ উপভোগ করে।
সরলার্থ- যে ব্যক্তি ইষ্টকের স্বরূপ। সংখ্যা ও অগ্নিচয়ন
বিধি জেনে তিন বার নাচিকেত অগ্নির সেবা করেন এবং যিনি নাচিকেত অগ্নিকে আত্মস্বরূপ
জেনে তাঁর ধ্যান করেন, তিনি শরীর ত্যাগের পূর্বেই যমের আকর্ষণ-রজ্জুরূপে অধর্মদিকে
ছিন্ন করে স্বর্গলোকে আনন্দভোগ করেন।
এষ তে৳গ্নির্নচিকেতঃ স্বর্গ্যো
যমবৃণীথা দ্বিতীয়েন বরেণ।
এতমগ্নিং তবৈব প্রবক্ষ্যন্তিব জনাস-
স্তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীষ্ব।।১৯
শব্দার্থ- নচিকেতঃ – হে নচিকেতা, এষঃ তে – এই যা তোমাকে বলা হল, স্বর্গ্যঃ অগ্নিঃ – স্বর্গদায়ক অগ্নিবিদ্যা, যম্- যে অগ্নি-বর, দ্বিতীয়েন বরেণ- দ্বিতীয় বরে, অবৃণীথাঃ – তুমি প্রার্থনা
করেছিলে, এতম্ অগ্নিম্ –এই অগ্নিকে, জনাসঃ – জনসাধারণ, তব এব – তোমারই নামে, প্রবক্ষ্যন্তি – ডাকবে, তৃতীয়ম্ বরম্ – তৃতীয় বর, বৃণীষ্ব – প্রার্থনা কর।
সরলার্থ- হে নচিকেতা, তুমি দ্বিতীয় বরে যা প্রার্থনা করে
ছিলে, স্বর্গলাভের উপায় স্বরূপ সেই অগ্নিবিষয়ক বরই তোমায় প্রদান করলাম। লোকে
তোমারই নামে এই অগ্নিকে অভিহিত করবে। এখন তৃতীয় বর প্রার্থনা কর।
যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে
অস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি চৈকে।
এতদ্বিদ্যামনুশিষ্টস্ত্বয়া৳হং
বরাণামেষ বরস্তৃতীয়ঃ।।২০
শব্দার্থ- প্রেতে মনুষ্যে – মৃত মানুষ সম্বন্ধে, যা ইয়ম্ -এই যে, বিচিকিৎসা – সংশয় আছে, অয়ম্- এই আত্মা, অস্তি-আছেন,ইতি -এই কথা, একে- কোন কোন লোক, চ -এব, ন অস্তি -আত্মা নেই,ইতি একে - কোন কোন লোক এই কথা বলেন, ইয়ম্ যা - এই যে, এতৎ - এই বিষয়টি, ত্বয়া - আপনার দ্বারা, অনুশিষ্টঃ - উপদিষ্ট হয়ে, অহম, - আমি, বিদ্যাম্ - জানতে চাই। বরাণাম্ - প্রার্থনার মধ্যে, এষঃ -এইটি, তৃতীয়ঃ বরঃ- তৃতীয় বর।।
সরলার্থ- নচিকেতা বললেন – মানুষের মৃত্যু হলে এই যে সংশয়
উপস্থিত হয়, কেউ বলেন পরলোকগামী আত্মা আছেন, কেউ বলেন তিনি নেই, আপনার উপদেশ থেকে
আমি আত্মার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব জানতে
চাই। এটিই আমার তৃতীয় বর।
সম্বন্ধ সূত্রঃ নচিকেতার এই আত্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রশ্ন
শুনে যমরাজ খুব প্রশংসা করলেন। ভাবলেন ঋষি কুমার খুবই প্রতিভাসম্পন্ন, কিন্তু
উপযুক্ত অধিকারী কিনা এই ভেবে তত্ত্বের দুর্বোধ্যত্ব বর্ণনা করে, নচিকেতাকে
বিভ্রান্ত ও নিশ্চেষ্ট করার চেষ্টা করছেন--
দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং পুরা
ন হি সুবিজ্ঞেয়মণুরেষ ধর্মঃ।
অন্যং বরং নচিকেতো বৃণীষ্ব
মা মোপরোৎসীরতি মা সৃজৈনম্।।২১
শব্দার্থ- যমরাজ বলছেন -পুরা - পূর্বকালে, অত্র - এই আত্মতত্ত্ব বিষয়ে, দেবৈঃ অপি - দেবতাদের দ্বারাও, বিচিকিৎসিতম্ - সংশয়
ছিল, হি - কারণ, এষঃ - এই অণুঃ - অতিসূক্ষ্ম, ধর্ম - আত্মতত্ত্ব, ন সুবিজ্ঞেয়ম্- সহজে জানা যায় না। নচিকেতঃ – হে নচিকেতা, অন্যম্ বরম্ – অন্য বর, বৃণীষ্ব –প্রার্থনা কর, মা – আমাকে, মা উপরোৎসী – উপরোধ করো না, মা – আমার কাছে, এনম্ –এই প্রার্থনা,অতি সৃজ – পরিত্যাগ কর।
সরলার্থ- নচিকেতাকে পরীক্ষা করার জন্য যম বললেন- এই বিষয়ে
দেবতাগণও সন্দেহ করেছেন। এই আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করেও লোকে বুঝতে পারে না। কারণ এই
আত্মতত্ত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অজ্ঞ লোকেরা বারবার শ্রবণ করেও বুঝতে পারে না। অতএব
হে নচিকেতা তুমি অন্য বর প্রার্থনা কর। এই বিষয়ে আমায় উপরোধ কর না। এই প্রার্থনা
ত্যাগ কর।
সম্বন্ধ সুত্রঃ নচিকেতা আত্মতত্ত্ব যে অত্যন্ত কঠিন এ
কথা শুনেও এতটুকু বিচলিত হলেন না। আরও দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন-
দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং কিল
ত্বং চ মৃত্যো যন্ন সুজ্ঞেয়মাত্থ।
বক্তা চাস্য ত্বাদৃগন্যো ন লভ্যো
নান্যো বরস্তুল্য এতস্য কশ্চিৎ।।২২
শব্দার্থ- নচিকেতা বললেন – কিল –যখন, দেবৈঃ অপি – দেবতারাও, অত্র – এই বিষয়ে, বিচিকিৎসিতম্ – সন্দেহ করেছিলেন, চ –এবং, মৃত্যো – হে যমরাজ, ত্বম্ – আপনি, যৎ - যেহেতু, ন সুজ্ঞেয়ম্ – সহজবোধ্য নয়, আত্থ – বলছেন, ত্বাদৃক্ অন্যঃ –আপনার মতো আর কেউ, অস্য- আত্মতত্ত্বের বক্তা – উপদেষ্টা চ- এবং, ন লভ্যঃ – পাওয়া যাবে না, এতস্য – এর, তুল্য –সমান, অন্যঃ কঃ চিৎ - অপর কোন, বরঃ – প্রার্থনা, ন – নেই।।
সরলার্থ- নচিকেতা বললেন – দেবগণেরও যখন এই বিষয়ে সন্দেহ
উপস্থিত হয়েছিল এবং হে যমরাজ, আপনিও যখন বলছেন
যে এটি সুবিজ্ঞেয় নয়, তখন আপনার মতো এমন আত্মতত্ত্বের বক্তা আর কেই পাওয়া
সম্ভব নয়, এর সমান বর অন্য বর আর কিছু থাকতে পারে না।
8
সম্বন্ধ সুত্রঃ বিষয়টি জটিল জেনেও নচিকেতা যখন ভয়
পেলেন না ও নিজের দাবি থেকে নড়লেন না, তখন তিনি প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
এবার যমরাজ পরীক্ষার জন্য তাঁর সামনে নানা রকমের প্রলোভনের বস্তু তুলে ধরছেন।
শতায়ুষঃ পুত্রপৌত্রান্ বৃণীষ্ব, বহূন্ পশূন্ হস্তি
হিরণ্যমশ্বান্।
ভূমের্মহদায়তনং বৃণীষ্ব, স্বয়ং চ জীবং শরদো
যাবদিচ্ছসি।।২৩
শব্দার্থ- যমরাজ নচিকেতাকে প্রলোভন
দেখাচ্ছেন – শতায়ুষঃ –শতবর্ষ, পুত্র পৌত্রান্ – পুত্র-পৌত্রাদি, বহূন্ পশূন্ - অনেক গবাদি
পশুদের, হস্তি-হিরণ্যম্ -প্রচুর সোনা ও হাতি, অশ্বান্ বৃণীষ্ব – অশ্ব প্রার্থনা কর, ভূমে মহৎব আয়তনম্ - বিশাল ভূমি
খণ্ড, বৃণীষ্ব – চেয়ে নাও, স্বয়ং চ – এবং তুমি নিজে, যাবৎ শরদঃ – যত বছর পর্যন্ত, ইচ্ছসি- ইচ্ছা করবে, জীব –জীবিত থাক।।
সরলার্থ- যম বললেন- তুমি শতায়ু পুত্র ও পৌত্র সকল প্রার্থনা
কর এবং বহু গবাদি পশু, হস্তী, অশ্ব, স্বর্ণ ও এই পৃথিবীতে বিশাল রাজ্য প্রার্থনা
কর, আর তুমি নিজে যত বছর খুশি জীবিত থাকতে পার।
এতত্তুল্যং যদি মন্যসে বরং, বৃণীষ্ব বিত্তং
চিরজীবিকাং চ।।
মহাভূমৌ নচিকেতস্ত্বমেধি, কামানাং ত্বা কাম্ভাজং
করোমি।।২৪
শব্দার্থ- এতৎ তুল্যম্ - এর মতো, যদি বরম্ - মন্যসে,
বৃণীষ্ব –প্রার্থনা কর, চ – অথবা, বিত্তম্
- প্রভুত ধন, চিরজীবিকাম্ - দীর্ঘজীবন। নচিকেতঃ – নচিকেতা, ত্বম্ - তুমি, মহাভূমৌ – বিশাল ভূখণ্ডের বা সাম্রাজ্যের, এধি – অধিপতি হও, ত্বা – তোমাকে,
কামানাম্ - দিব্য ও পার্থিব সকল কাম্যবস্তুর, কামভাজম্ -উত্তম ভোগী, করোমি – করে দিচ্ছি।।
সরলার্থ- যদি এর সমান অন্য কোন বর পেতে ইচ্ছা কর, তা
প্রার্থনা কর। আর চিরজীবন এবং স্বর্ণ ও রত্নাদি প্রার্থনা কর। হে নচিকেতা, তুমি
বিশাল ভূভাগের অধিপতি হও। আমি তোমাকে দিব্য ও লৌকিক কাম্যবস্তু সমূহে যথেচ্ছ ভোগের
ক্ষমতা প্রদান করছি।
সম্বন্ধ সূত্রঃ এই সব প্রলোভন
সত্ত্বেও যখন নচিকেতা প্রার্থনায় অটল থাকলেন তখন যমরাজ তাঁকে স্বর্গের দেবভোগ্য
সম্পদের প্রলোভন দেখাচ্ছেন--
যে যে কামা দুর্লভা মর্ত্যলোকে
সর্বান্ কামাংশ্ছন্দতঃ প্রার্থয়স্ব।
ইমা রামাঃ সরথাঃ সতূর্যা
ন হীদৃশা লম্ভনীয়া মনুষ্যৈঃ।
আভির্মৎপ্রত্তাভিঃ পরিচারয়স্ব
নচিকেতো মরণং মা৳নুপ্রাক্ষীঃ।২৫
শব্দার্থ- মর্ত্যলোকে –পৃথিবীতে, যে যে কামাঃ – যে যে ভোগ্যবস্তু, দুর্লভাঃ –দুর্লভ, সর্বান্ কামান্ - সেই সমস্ত ভোগ্য বস্তু,
ছন্দতঃ প্রার্থয়স্ব – ইচ্ছানুযায়ী প্রার্থনা।
ইমা – এই সমস্ত, রামাঃ – সুন্দরী রমণীবৃন্দ, সরথাঃ –রথাসীন, সতূর্যাঃ –নানা বাদ্যযন্ত্র যুক্ত, ঈদৃশাঃ – এই রকম রমণীগণ, হি – নিশ্চিত, মনুষ্যৈঃ- সাধারণ মানুষের, ন লম্ভনীয়া – কোন ভাবেই লভ্য নয়, মৎপ্রত্তাভিঃ আমার দেওয়া, আভিঃ – এই রমণীদের দ্বারা, পরিচারয়স্ব- নিজের সেবা পরিচর্যা
করাও, নচিকেতঃ – হে নচিকেতা, মরণম্ - মৃত্যুর পর, মা অনুপ্রাক্ষীঃ – এ কথা জিজ্ঞাসা করো না।
9
সরলার্থ- পৃথিবীতে যা যা কাম্য এবং দুর্লভ, সেই সমস্ত
প্রার্থনা কর। এই যে সুখদায়িনী অপ্সরাগণ রথে আরোহণ করে এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে অবস্থিত আছে, এমন
অপ্সরা মনুষ্যের লভ্য নয়। এদের দ্বারা তুমি নিজের সেবা করাতে পারো। হে, নচিকেতা,
মরণ বিষয়ে এমন প্রশ্ন করো না ।
সম্বন্ধ সূত্রঃ যমরাজ নানা প্রলোভন দেখিয়েও নচিকেতাকে পরাস্ত
করতে পারলেন না। নচিকেতা জানতেন যে এই সব ইহলোকের ও পরলোকের চরম ভোগ সুখ,
আত্মজ্ঞানের তুলনায় অতি তুচ্ছ। পূর্ণ অনাসক্তিতে প্রতিষ্ঠিত নচিকেতা বলছেন --
শ্বোভাবা মর্ত্যস্য যদন্তকৈতৎ, সর্বেন্দ্রিয়াণাং
জরয়ন্তি তেজঃ।
অপি সর্বং জীবিতমল্পমেব, তবৈব বাহাস্তব নৃত্যগীতে।।২৬
শব্দার্থ- নচিকেতা বললেন – অন্তক – হে সর্ববিনাশক, শ্বোভাবাঃ – (শ্বঃ আগামীকাল, ভাবাঃ থাকবে কিনা সন্দেহ অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী) মর্ত্যস্য – মরণশীল জীবের, সর্বেন্দ্রিয়াণাম্ – ইন্দ্রিয়সকলের, যৎ এতৎ তেজঃ – এই যে শক্তি, জরয়ন্তি – ক্ষয় করে, অপি সর্বম্ – এ ছাড়া সমস্ত, জীবিতম্ – আয়ু, অল্পম্ এব – অল্পই, তব –আপনার, বাহাঃ – রথাদি বাহন, নৃত্যগীতে –অপ্সরাদের নাচ গান, তব এব – আপনারই থাক।
সরলার্থ- হে যমরাজম আপনার বর্ণিত ভোগ্যবস্তুগুলি কাল
পর্যন্ত থাকবে কি না, তা অনিশ্চত, এরা মানুষের ইন্দ্রিয়ের শক্তিকে ক্ষয় করে। তা
ছাড়া হিরণ্যগর্ভাদি সকলেরই জীবন স্বল্প। অতএব রথাদি আপনারই থাকুক, নৃত্যগীতও
আপনারই থাকুক।
ন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যো, লপ্স্যামহে বিত্তমদ্রাক্ষ্ম চেৎ ত্বা।
জীবিষয়ামো যাবদীশিষ্যতি ত্বং বরস্তু মে বরণীয়ঃ স এব।।২৭
শব্দার্থ- মনুষ্যঃ – মানুষ, বিত্তেন- ধনসম্পদের দ্বারা, ন তর্পণীয়ঃ – পরিতৃপ্ত হয় না, ত্বা – আপনাকে, চেৎ -
যদি, অদ্রাক্ষ্ম –দেখে থাকি,
বিত্তম্ -ধনাদি, লপ্স্যামহে – লাভ করব, যাবৎ যতদিন, ত্বম্ -আপনি ঈশিষ্যসি- শাসন করবেন, জীবিষ্যামঃ – জীবিত থাকব। তু –পরন্তু, সঃ এব-
সেই আত্মজ্ঞান ,বরঃ এব –বরই, মে – আমার , বরণীয়ঃ – কাম্য।
সরলার্থ- ,মানুষ
কখনও বিত্তের দ্বারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। আপনাকে যখন দর্শন করলাম তখন আমার কামনা
থাকলে দর্শনের ফলে তা অবশ্যই লাভ করব। আর আপনি যতদিন যমপদে বর্তমান থেকে প্রভুত্ব
করবেন তত দিন আমি জীবিত থাকবো, তার জন্য প্রার্থনা্র প্রয়োজন নেই। তাই
আত্ম-বিজ্ঞান লাভ হল আমার প্রার্থনীয় বর।
সম্বন্ধ সূত্রঃ এই ভাবে ভোগের তুচ্ছতা প্রমাণ করে তাঁর
প্রার্থনীয় বরের গুরুত্ব জানিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে যমরাজকে বললেন—
10
অজীর্যতামমৃতানামুপেত্য
জীর্যন্ মর্ত্যঃ ক্বধঃস্থ প্রজানন্।
অভিধ্যায়ন্ বর্ণরতিপ্রমোদান্
অতিদীর্ঘে জীবিতে কো রমেত।।২৮
শব্দার্থ –ক্বধঃস্থঃ –( কু+অধঃ+স্থঃ, অধঃ – নিচে, কু –পৃথিবীতে, স্থঃ – অবস্থিত) কঃ – কোন্, জীর্যন্ মর্ত্যঃ – জরামরণশীল ব্যক্তি, অজীর্যতাম্ - জরা রহিত,
অমৃতানাম্ -অমর মহাত্মাদের, উপেত্য – সঙ্গ লাভ
করেও, বর্ণ-রতি-প্রমোদান্ - সৌন্দর্য, বিভিন্ন আমোদ-প্রমোদ, অভিধ্যায়ন্ - বার
বার চিন্তা করে, অতিদীর্ঘে – বহুদিন
পর্যন্ত, জীবিতে – জীবিত থাকতে, রমেত – আনন্দ পায়।
সরলার্থ- হে মৃত্যু,
পৃথিবীর অধিবাসী কোন্ জরা-মরণশীল ব্যক্তি অজর অমর দেবতাদের সামনে উপস্থিত
হয়ে তাঁদের কৃপায় উৎকৃষ্ট প্রয়োজন সিদ্ধ হতে পারে জেনেও অপ্সরাদের গীতি প্রভৃতি
সুখ অনিত্য জেনেও দীর্ঘকাল বাঁচবার জন্য ইচ্ছা করতে পারে?
যস্মিন্নিদং বিচিকিৎসন্তি মৃত্যো
যৎ সাম্পরায়ে মহতি ব্রূহি নস্তৎ।
যো৳য়ং বরো গূঢ়মনুপ্রবিষ্টো
নান্যং তস্মান্নচিকেতা বৃণীতে।।২৯
শব্দার্থ- মৃত্যো – হে যমরাজ, যস্মিন্ - যাতে, ইদম্ বিচিকিৎসন্তি – এরূপ সংশয় করে থাকে, যৎ -চ সাম্পরায়ে – পরলোক সম্বন্ধী, মহতি – মহৎ কাজের নিমিত্ত, তৎ নঃ ব্রূহি – তা আমাদের বলুন।
সরলার্থ- হে যমরাজ, যে আত্মার সম্বন্ধে
লোকের মনে পরলোক আছে কিনা সংশয় উপস্থিত হয়, যে তত্ত্বের নির্ণয়ে মুক্তি সাধিত হয়,
তাই আমাকে বলুন। এরপর উপনিষদ স্বয়ং বলছেন –
অতি দুর্বিজ্ঞেয় এর বর ছাড়া নচিকেতা আর কিছুই প্রার্থনা করে না।
ইতি কঠোপনিষদি
প্রথমাধ্যায়ে প্রথমা বল্লী
আপনি কত ভাবে আমাদের শিক্ষা দেবেন আপনি আমাদের কাছে ধ্রুব তারা আপনি আমাদের esor এর কাছে নিয়ে যেতে কত ভাবে আমাদের শিক্ষা দেবেন আমরা যে আপনার শিক্ষা নিতে পারি প্রণাম শিক্ষা গুরু শিখা মন্ডল ব জ ব জ
ReplyDelete