শংকরাচার্য ।। পর্ব - ৯ ।। স্বামী হরিময়ানন্দ

                          ।।  শংকরাচার্য ।।                                                                                                 ---- স্বামী হরিময়ানন্দ © ধারাবাহিক রচনা "এই ষোড়শবর্ষীয় বালকের রচনা আধুনিক সভ্য জগতের এক বিস্ময়" - স্বামী বিবেকানন্দ শ্রুতিস্মৃতি পুরাণানাম্‌ আলয়ং করুণালয়ম্‌। নমামি ভগবদপাদং শংকরম্‌ লোকশংকরম্‌। =============পর্ব-৯============= মণ্ডণ পত্নী উভয় ভারতী দেবী সরস্বতীর সমতুল্য ছিলেন মণ্ডনের পত্নী। যিনি এই   বিতর্ক সভার মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এখন বললেন, হে যতীশ্বর, আপনি আমার স্বামীকে পরাজিত করেছেন - এ কথা সত্য। কিন্তু   আমাকে পরাজিত না করলে আপনার পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। আমি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী, কাজেই আপনার অর্ধেক বিজয় হয়েছে, সম্পূর্ণ নয়। আচার্...

গীতা # অধ্যায় ৬// Srimad Bhagavad Gita


শ্রীমদ ভগবদ্গীতা



Vedanta Study

 অনুবাদঃ স্বামী হরিময়ানন্দ



ষষ্ঠ অধ্যায় 

শ্রীভগবান উবাচ

অনাশ্রিত  কর্মফলং কার্যং  কর্ম করোতি যঃ ।

স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্ন চাক্রিয়ঃ।। ১

পদবিচ্ছেদ – অনাশ্রিতঃ কর্মফলম্‌ কার্যম্‌ কর্ম করোতি যঃ/ সঃ সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নিঃ ন চ অক্রিয়ঃ।।

শব্দার্থ – অনাশ্রিতঃ – প্রত্যাশা না করে, কর্মফলম্‌ – কর্মফলকে, কার্যম্‌ –কর্তব্য,কর্ম – কর্ম, করোতি – করেন, যঃ – যিনি, সঃ – সেই, সন্ন্যাসী –সন্ন্যাসী, চ – ও,যোগী –যোগী, চ- আর, ন- নয়, নিরগ্নিঃ –অগ্নিত্যাগী, ন- নয়, চ –আর অক্রিয়ঃ – শারীরকর্মত্যাগী নন।

সরলার্থ – শ্রীভগবান বললেন – যিনি কর্মফলের প্রত্যাশা না করে কর্তব্য কর্ম অনুষ্ঠান করেন তিনিই সন্ন্যাসী এবং যোগী। আর যিনি কেবল অগ্নিসাধ্য যজ্ঞাদি কর্ম ও পূর্ত প্রভৃতি কর্ম ত্যাগ করেছেন, তিনি সন্ন্যাসীও নন, যোগীও নন।।

যং সংন্যাসমিতি প্রাহুর্যোগং তং বিদ্ধি পাণ্ডব।

ন হ্যসংনস্যস্তসংকল্পো  যোগী ভবতি কশ্চন।। ২

পদবিচ্ছেদ –যম্‌ সন্যাসম্‌ ইতি প্রাহুঃ যোগম্‌ তম্‌ বিদ্ধি পাণ্ডব/ ন হি অসন্যস্ত- সংকল্পঃ যোগী ভবতি কশ্চন।।

শব্দার্থ – যম্‌ – যাকে, সংন্যাসম্‌ –সন্ন্যাস, ইতি –এরূপ,প্রাহুঃ – বলেন, যোগম্‌ –যোগ, তম্‌ – তাকেই, বিদ্ধি – জানবে, পাণ্ডব – হে পাণ্ডব, ন – না, হি – যেহেতু, অসংন্যস্ত-সংকল্পঃ – সংকল্প ত্যাগী না হলে, যোগী – যোগী, ন ভবতি – হয় না, কশ্চন –কেউ।

সরলার্থ – হে পাণ্ডব, পণ্ডিতগণ যা সন্ন্যাস বলে নির্দেশ করেছেন, তাই যোগ বলে জেনো, কারণ ফল সঙ্কল্প ত্যাগ না করলে কেউই যোগী হতে পারে না।

ক্লাস শুনুন এই লিংকে

                          https

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

আরুরুক্ষোর্মুনের্যোগং কর্ম কারণমুচ্যতে।

যোগারূঢ়স্য তস্যৈব শমঃ কারণমুচ্যতে।। ৩

পদবিচ্ছেদ – আরুরুক্ষোঃ মুনেঃ যোগম্‌ কর্ম কারণম্‌ উচ্যতে/ যোগারূঢ়স্য তস্য এব শমঃ কারণম্‌ উচ্যতে।।

শব্দার্থ –আরুরুক্ষোঃ –আরূঢ় হতে ইচ্ছুক, মুনেঃ – মননশীল ব্যক্তি,যোগম্‌ - যোগে, কর্ম- নিষ্কাম কর্ম, কারণম্‌ - সহায়, উচ্যতে – কথিত হয়, যোগারূঢ়স্য – যোগে আরোহণ করলে, তস্য সেই, এব – ই, শমঃ – কর্মফল নিবৃতি, কারণম্‌ - সহায়, উচ্যতে – কথিত হয়।

সরলার্থ –যে মুনি জ্ঞানযোগে  আরোহণ করতে ইচ্ছা করেন, কর্মই তাঁর সহায়, আর যিনি তাতে আরোহণ করেছেন, কর্মফল নিবৃত্তিই তাঁর সাধন সহায় বলে কথিত হয়।  

যদা হি নেন্দ্রিয়ার্থেষু ন কর্মস্বনুজ্জতে।

সর্বসংকল্পসংস্যাসী যোগারূঢ়স্তদোচ্যতে।।৪

পদবিচ্ছেদ – যদা হি ন ইন্দ্রিয়ার্থেষু ন কর্মসু অনু-সজ্জতে/ সর্ব-সংকল্পসংন্যাসী যোগ-আরূঢ়ঃ তদা উচ্যতে।।

শব্দার্থ – যদা – যখন, হি –ও, ন – না, ইন্দ্রিয়ার্থেষু – ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়ে, ন – না, কর্মসু – কর্মসমূহে, অনু-সজ্জতে – অনাসক্ত, সর্ব-সংকল্পসংন্যাসী – সকল সংকল্প ত্যাগী, যোগ-আরূঢ়ঃ – যোগে আরূঢ়, তদা – তখন, উচ্যতে –কথিত হন।

সরলার্থ – যিনি সর্বপ্রকার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করে ও ইন্দ্রিয়ের ভোগ্য বিষয়ে (শব্দাদি বিষয়ে) ও ভোগসাধন কর্মে আর আসক্ত না হন, তখন তিনি যোগারূঢ় বলে উক্ত হন।

উদ্ধরেদাত্মনাত্মনং নাত্মানমবসাদয়েৎ।

আত্মৈব হ্যাত্মনো  বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ।।৫

পদবিচ্ছেদ –উদ্ধরেৎ আত্মনা আত্মনম্‌  ন আত্মানম্‌ অবসাদয়েৎ /আত্মা এব হি আত্মনঃ বন্ধুঃ আত্মা এব রিপুঃ আত্মনঃ।।

শব্দার্থ – উদ্ধরেৎ - উদ্ধার করে, আত্মনা – নিজের দ্বারা, আত্মনম্‌ - নিজেকে, ন –না, আত্নানম্‌ -মনকে, অবসাদয়েৎ - অধোগামী, আত্মা –মন, এব –ই, হি –এই আত্মনঃ – নিজের, বন্ধুঃ – মিত্র, আত্মা –মন, এব –ই, রিপুঃ – শত্রু, আত্মনঃ –নিজের।।

সরলার্থ – বিবেকযুক্ত মনের দ্বারা মনকে মোহমুক্ত করবে, মনকে অধোগামী করবে না, কারণ বিবেকযুক্ত মনই আত্মজ্ঞান লাভের পক্ষে বন্ধুস্বরূপ, অবিবেকী মনই নিজের শত্রু বলে জানবে।

বন্ধুরাত্মাত্মন্সতস্য যেনাত্মৈবাত্মনা জিতাঃ ।

অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ।। ৬

পদবিচ্ছেদ –বন্ধুঃ আত্মা আত্মনঃ তস্য যেন আত্মা এব আত্মনা জিতঃ অনাত্মনঃ তু শত্রুত্বে বর্ততে এব শত্রুবৎ।

শব্দার্থ – বন্ধুঃ – মিত্র, আত্মা – নিজে, আত্মনঃ –নিজের, তস্য – সেই, যেন-যেই, আত্মা –মন, এব – ই, আত্মনা – মনের দ্বারা, জিতঃ – জয় করা, অনাত্মনঃ – অবশীকৃত দেহ মন যার, তু – কিন্তু, শত্রুত্বে – শত্রুর মত, বর্ততে – প্রবৃত্ত হয়, এব –ই, শত্রুবৎ - অপকারী।।

সরলার্থ – যিনি মন দ্বারা দেহ ও ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করেছেন, সেই বিবেকী মনই তাঁর বন্ধু, কিন্তু অবশীকৃতচিত্ত ব্যক্তির  মনই শত্রুর মতো অপকার করতে থাকে।

 

জিতাত্মনঃ প্রশান্তস্য পরমাত্মা সমাহিতঃ।

শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু তথা মানাপমানয়োঃ।।৭

পদবিচ্ছেদ- জিত-আত্মনঃ প্রশান্তস্য পরমাত্মা সমাহিতঃ/শীত উষ্ণ-সুখদুঃখেষূ তথা মান-অপমানয়োঃ।।

 

শব্দার্থ –জিত-আত্মনঃ –জিতেন্দ্রিয়, প্রশান্তস্য – বিক্ষেপরহিত ব্যক্তির, পরমাত্মা – পরমাত্মা , সমাহিতঃ –আত্মভাবে স্থিত, শীত উষ্ণ-সুখদুঃখেষু – শীত উষ্ণ ও সুখ-দুঃখাদিতে, তথা –আর, মান-অপমানয়োঃ – মন ও অপমানে।।

 

সরলার্থ – যিনি বিক্ষেপ রহিত হয়ে  পরমাত্মায় স্থিত হন, তিনি শীত, উষ্ণ, সুখ, দুঃখ, মান ও অপমান উপস্থিত হলেও, কেবল সেই সংযত চিত্ত ও রাগদ্বেষাদিশূন্য ব্যক্তিরই মন নির্বিকার অবস্থায় অবস্থান করে।

জ্ঞান বিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ।

যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ ।। ৮

পদবিচ্ছেদ –জ্ঞান-বিজ্ঞান-তৃপ্ত-আত্মা কূটস্থঃ বিজিতেন্দ্রিয়ঃ/

যুক্তঃ ইতি উচ্যতে যোগী সম-লোষ্ট-অশ্ম-কাঞ্চনঃ।।

 

শব্দার্থ – জ্ঞান-বিজ্ঞান-তৃপ্ত-আত্মা – শাস্ত্র ও তত্ত্বজ্ঞানে যিনি পরিতৃপ্ত, কূটস্থঃ –নির্বিকার, বিজিতেন্দ্রিয়ঃ – জিতেন্দ্রিয়, যুক্তঃ ইতি – যোগারূঢ় বলে, উচ্যতে – কথিত হন, যোগী – যোগী ব্যক্তি, সম-লোষ্ট-অশ্ম-কাঞ্চনঃ – মাটি, পাথর ও সোনাতে সমদর্শী।।

সরলার্থ –যাঁর মন শাস্ত্র ও তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা পরিতৃপ্ত হয়েছে, যিনি নির্বিকার ও জিতেন্দ্রিয় এবং যিনি মৃত্তিকা, প্রস্তর ও কাঞ্চনে তুল্যজ্ঞান করেন, সেই যোগীই যোগারূঢ় উক্ত হন।

 

সুহৃন্মিত্রার্যুদাসীন্মধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু।।

সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে।।৯

পদবিচ্ছেদ –সুহৃৎ-মিত্র-অরি-উদাসীন-মধ্যস্থ-দ্বেষ্য-বন্ধুষু/সাধুষু অপি চ পাপেষু সমবুদ্ধিঃ বিশিষ্যতে।।

শব্দার্থ –সুহৃৎ-মিত্র-অরি-উদাসীন-মধ্যস্থ-দ্বেষ্য-বন্ধুষু –সুহৃৎ মিত্র শত্রু, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য ও বন্দুতে, সাধুষু- সদাচারী, অপি –ও .

 সরলার্থ – যিনি সুহৃদ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু এবং সাধু ও পাপীতে সমজ্ঞান বিশিষ্ট তিনিই যথার্থ সমদর্শী।

যোগী যুঞীত সততমাত্মানং রহসি স্থিতঃ।

একাকী যতচিত্তাত্মা নিরাশীরপরিগ্রহঃ।। ১০

পদবিচ্ছেদ –যোগী যুঞ্জীত সততম্‌ আত্মানম্‌ রহসি স্থিতঃ/ একাকী যত-চিত্ত-আত্মা নিরাশীঃ অপরিগ্রহ।।

সরলার্থ – যোগাভ্যাসকারী ব্যক্তি একাকী নির্জন স্থানে নিরন্তর অবস্থান করে, আকাঙ্খা ও পরিগ্রহ শূন্য হয়ে অন্তঃকরণ ও দেহ বশীভূত করে চিত্ত সমাহিত করবেন।

শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য  স্থিরমাসনমাত্মনঃ।

নাত্যুচ্ছ্রিতং নাতিনীচং চৈলাজিনকুশোত্তরম্‌।।১১

তত্রৈকাগ্রং মনঃ কৃত্বা যতচিত্তেন্দ্রিয়ক্রিয়ঃ।

উপবিশ্যাসনে  যুঞ্জ্যাদ্‌ যোগ্মাত্মবিশুদ্ধয়ে।।১২

পদবিছেদ – শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরম আসনম্‌ আত্মনঃ / ন অতি উচ্ছ্রিতম্‌ ন অতি নীচম্‌ চৈল-অজিন-কুশ-উত্তরম্‌।।

তত্র একাগ্রম্‌ মনঃ কৃত্বা যত-চিত্ত-ইন্দ্রিয়-ক্রিয়ঃ/উপবিশ্য আসনে যুঞ্জাৎ যোগম্‌ আত্ম-বিশুদ্ধয়ে।।

শব্দার্থ – শুচৌ দেশে – পবিত্র স্থানে, প্রতিষ্ঠাপ্য – স্থাপন করে, স্থিরম্‌ –স্থির, আসনম্‌ – আসনকে, আত্মনঃ – নিজের, ন-অতি-উচ্ছ্রিতম্‌ – খুব উঁচু নয়, ন – অতি-নীচম্‌ – খুব নিচুতে নয়, চৈল-অজিন-কুশ-উত্তরম্‌ – কুশ, মৃগচর্ম ও বস্ত্র , তত্র –সেই, একাগ্রম্‌ – একাগ্র, মনঃ – মনকে, কৃত্বা – করে, যত-চিত্ত-ইন্দ্রিয়-ক্রিয়ঃ – চিত্ত ও ইন্দ্রিয় ক্রিয়া সকলকে বশীভূত করে, উপবিশ্য –বসে, আসনে –আসনে,যুঞ্জাৎ - অভ্যাস করবে, যোগম্‌ –যোগ, আত্ম-বিশুদ্ধয়ে – চিত্তশুদ্ধির নিমিত্ত।

সরলার্থ – জিতচিত্ত ও জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি অন্তঃকরণের শুদ্ধির জন্য একাগ্র মনে পবিত্র স্থানে ক্রমান্বয়ে কুশ, মৃগচর্ম ও বস্ত্রদ্বারা প্রস্তুত, অতি উচ্চও নয়, বা অতি নিচুও নয় – এই রকম স্থির আসন স্থাপন করে তাতে উপবেশন  করে যোগ অভ্যাস করবেন।

সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ।

সম্প্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্‌।।১৩

পদবিচ্ছেদ – সমম্‌ কায়-শিরো-গ্রীবম্‌ ধারয়ন্‌ অচলম্‌ স্থিরঃ/ সংপ্রেক্ষ্য নাসিকা-অগ্রম্‌ স্বম্‌ দিশঃ চ অনব-লোকয়ন্‌।।

শব্দার্থ – সমম্‌ - সমান, কায়-শিরো-গ্রীবম্‌ - শরীর, মস্তক ও গ্রীবাকে, ধারয়ন্‌ - ধারণ করে, অচলম্‌ - অচঞ্চল ভাবে, স্থিরঃ – স্থির হয়ে, সংপ্রেক্ষ্য – দৃষ্টি স্থির করে, নাসিকা-অগ্রম্‌ - নাসিকার অগ্রভাগে, স্বম্‌ - নিজের, দিশঃ – দিকগুলি, চ-ও, অনব-লোকয়ন্‌ - অবলোকন না করে।।

সরলার্থ –শরীর,মস্তক ও গ্রীবা সরলভাবে রেখে এবং দৃষ্টিকে অন্যান্য দিক থেকে সংযত করে নিজ নাসিকার অগ্রভাগে  নিবিষ্ট রেখে যোগ অভ্যাস করবে।

প্রশান্তাত্মা বিগতভীর্ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ।

মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মৎপরঃ।।১৪

পদবিচ্ছেদ – প্রশান্ত-আত্মা বিগতভীঃ ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ  মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তঃ যুক্তঃ আসীত মৎপরঃ।।

শব্দার্থ –প্রশান্ত-আত্মা –প্রশান্ত চিত্ত, বিগতভীঃ – নির্ভয়, ব্রহ্মচারিব্রতে –ব্রহ্মচারি ব্রতে, স্থিতঃ – অবস্থিত, মনঃ –মন, সংযম্য – সংযত করে, মচ্চিত্তঃ – আমাতেই চিত্তযুক্ত, যুক্তঃ – সমাহিত হয়ে, আসীত – অবস্থান করবেন।

সরলার্থ – যোগী প্রশান্ত চিত্ত, নির্ভর, ব্রহ্মচারী ব্রত পরায়ণ, সংযতচিত্ত ও মৎপরায়ণ হয়ে আমাতেই চিত্ত সমর্পণ করে যুক্তভাবে অবস্থান করবে।

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী নিয়তমানসঃ।

শান্তিং নির্বাণপরমাং মৎসংস্থামধিগচ্ছতি।।১৫

পদবিচ্ছেদ –যুঞ্জন্‌ এবম্‌ সদা আত্মানম্‌ যোগী নিয়ত-মানসঃ শান্তিম্‌ নির্বাণ-পরমাম্‌ মৎ-সংস্থাম্‌ অধিগচ্ছতি।।

শব্দার্থ – যুঞ্জন্‌ - যুক্ত করে, এবম্‌ - এই ভাবে, সদা – নিরন্তর, আত্মানম্‌ - মনকে, যোগী- যোগী, নিয়ত-মানসঃ – সংযত চিত্ত, শান্তিম্‌ -শান্তিকে, নির্বাণ-পরমাম্‌ - মোক্ষপ্রদ, মৎ-সংস্থাম্‌ অধিগচ্ছতি – লাভ করেন।।

সরলার্থ –সংযতচিত্ত যোগী এইভাবে অন্তঃকরণকে সমাহিত করলে আমার স্বরূপভূত মোক্ষপ্রদ পরম শান্তি লাভ করেন।

নাত্যশ্নতস্তু যোগো৳স্তি ন চৈকান্তমনশ্নতঃ।

ন চাতি স্বপ্নশীলস্য জাগ্রতো নৈব চার্জুন।। ১৬

পদবিচ্ছেদ – ন অতি অশ্নতঃ তু যোগঃ অস্তি ন চ একান্তম্‌ অনশ্নতঃ/ ন চ অতি স্বপ্নশীলস্য জাগ্রতঃ ন এব চ অর্জুন।।

শব্দার্থ – ন –না, অতি – অধিক, অশ্নতঃ – ভোজনকারী, তু – কিন্তু, যোগঃ – এই যোগ, অস্তি – হয়, ন – না, চ – এবং, একান্তম্‌ - একেবারে, অনশ্নতঃ – নিরাহারীর, ন – না, চ – এবং, অতি – অতিশয়, স্বপ্ন-শীলস্য – নিদ্রালুর, জাগ্রতঃ – বিদ্রাহীন ব্যক্তির, ন – না, এব-ই, চ – ও, অর্জুন – হে অর্জুন।।

সরলার্থ –হে অর্জুন, অধিক ভোজনকারী বা একেবারে অনাহারী এবং অতি নিদ্রালু বা একেবারে নিদ্রাহীন ব্যক্তির যোগ হয় না।

যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু।

যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দঃখহা।।১৭

পদবিচ্ছেদ – যুক্ত-আহার-বিহারস্য যুক্ত-চেষ্টস্য কর্মসু যুক্ত-স্বপ্ন-অববোধস্য যোগঃ ভবতি দুঃখহা।।

শব্দার্থ –যুক্ত-আহার-বিহারস্য – পরিমিত আহার ও বিহার, যুক্ত-চেষ্টস্য – পরিমিত চেষ্টাকারীর, কর্মসু- কর্ম সমূহে, যুক্ত-স্বপ্ন-অববোধস্য – পরিমিত নিদ্রা ও জাগরণকারীর, যোগঃ – যোগ, ভবতি – হয়। দুঃখহা- সংসার দুঃখ নাশক।।

সরলার্থ –যাঁর আহার, বিহার, কর্মচেষ্টা, নিদ্রা ও জাগরণ পরিমিত, তিনিই সংসার-দুঃখ বিনাশক এই যোগ লাভ করতে পারেন।

যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে।

নিঃস্পৃহঃ সর্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা।।১৮

পদবিচ্ছেদ –যদা বিনিয়তম্‌ চিত্তম্‌ আত্মনি এব অবতিষ্ঠতে নিঃস্পৃহঃ সর্বকামেভ্যঃ  যুক্তঃ ইতি উচ্যতে তদা।।

শব্দার্থ – যদা – যখন, বিনিয়তম্‌ -সংযত, চিত্তম্‌ -চিত্ত, আত্মনি – আত্মাতে, এব –ই, অবতিষ্ঠতে – অবস্থিত হয়, নিঃস্পৃহঃ – স্পৃহাশূন্য ব্যক্তি , সর্বকামেভ্যঃ –কাম্য বিষয় থেকে, যুক্তঃ – যোগযুক্ত , ইতি – এরূপ, উচ্যতে –উক্ত হন, তদা – তখন।।

সরলার্থ – যখন বশীভূতচিত্ত আত্মাতেই অবস্থান করে ও যোগী সর্বপ্রকার কাম্য বিষয়ে নিস্পৃহ হন তখনই তাঁকে যোগযুক্ত বলা হয়।

যথা দীপো নিবাতস্থো নেঙ্গতে সোপমা স্মৃতা।

যোগিনো যতচিত্তস্য যুঞ্জতো যোগ্মাত্মনঃ।।১৯

পদবিচ্ছেদ –যথা দীপঃ নিবাতস্থঃ ন ইঙ্গতে সা উপমা স্মৃতা/যোগিনঃ যতচিত্তস্য যুঞ্জতঃ যোগম্‌ আত্মনঃ।।

 

শব্দার্থ – যথা – যেমন, দীপঃ – প্রদীপ, নিবাতস্থঃ – বায়ুরহিত স্থানে, ন ইঙ্গতে – বিচলিত হয় না, সা – সেই, উপমা – দৃষ্টান্ত, স্মৃতা – জানবে, যোগিনঃ – যোগীর, যতচিত্তস্য –সংযত চিত্তের, যুঞ্জতঃ অভ্যাসকারী, যোগম্‌ – নিরোধ, আত্মনঃ – পরমাত্মায়।

সরলার্থ – জিতচিত্ত যোগী ব্যক্তির আত্ম-যোগ অনুষ্ঠানকালে চিত্ত বায়ু প্রবাহশূন্য নিষ্কম্প দীপের মতো পরমাত্মায় অচঞ্চল হয়ে অবস্থান করে থাকে। দীপের সঙ্গে যোগচিত্ত ব্যক্তির এই উপমা।

যত্রোপরমতে চিত্তং নিরুদ্ধং যোগসেবয়া।

যত্র চৈবাত্মনাত্মানং পশ্যন্নাত্মনি তুষ্যতি।।২০

পদবিচ্ছেদ –যত্র উপরমতে চিত্তম্‌ নিরুদ্ধম্‌ যোগ সেবয়া/ যত্র চ এব আত্মনা আত্মনম্‌ পশ্যন্‌ আত্মনি তুষ্যতি।।

শব্দার্থ – যত্র – যেস্থানে, উপরমতে – সর্ববৃত্তিশূন্য হয়, চিত্তম্‌ - চিত্ত, নিরুদ্ধম্‌ - নিষ্ক্রিয়, যোগ-সেবয়া – যোগাভ্যাস দ্বারা, যত্র – যেখানে, চ-ও, এব-ই, আত্মনা – বুদ্ধিদ্বারা, আত্মানম্‌ - পরমাত্মাকে, পশ্যন্‌ - জেনে, আত্মনি – আত্মাতে, তুষ্যতি – তুষ্ট হন।।

সরলার্থ -  যে অবস্থায় চিত্ত যোগানুষ্ঠান দ্বারা নিরুদ্ধ হয়ে সর্ববৃত্তি শূন্য হয়ে থাকে যে অবস্থায় বিশুদ্ধ অন্তকরণ দ্বারা পরমাত্মাকে জেনে আত্মাতেই পরিতৃপ্ত হয় তাই যোগ।

সুখমাত্যন্তিকং যত্তদ্‌ বুদ্ধিগ্রাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্‌।

বেত্তি যত্র ন চৈবায়ং স্থিতশ্চলতি তত্ত্বতঃ।।২১

পদবিচ্ছেদ –সুখম্‌  আত্যন্তিকম্‌ যৎ তৎ বুদ্ধিগ্রাহ্যম্‌ অতীন্দ্রিয়ম্‌/ বেত্তি যত্র ন চ এব অয়ম্‌ স্থিতঃ চলতি তত্ত্বতঃ।।

শব্দার্থ –সুখম্‌ -সুখ, আত্যন্তিকম্‌ -সুখতীত,যৎ - যে, তৎ -তা, বুদ্ধিগ্রাহ্যম্‌ - শুদ্ধবুদ্ধি দ্বারা নিশ্চয় করা, অতীন্দ্রিয়ম্‌ -ইন্দ্রিয়ের অতীত, বেত্তি – জানে, যত্র – যে অবস্থায়, ন – না, চ – ও, এব – ই, অয়ম্‌ - এই যোগী, স্থিতঃ – স্থিত হয়ে, চলতি – বিচলিত, তত্ত্বতঃ – তত্ত্ব থেকে।।

সরলার্থ – যে অবস্থায় শুদ্ধ বুদ্ধির দ্বারা সুখাতীত, অতিন্দ্রিয় যে তত্ত্ব তা নিশ্চিতরূপে অবগত হওয়া যায় এবং যে অবস্থায় অবস্থিত হল্রে আর আত্মতত্ত্ব থেকে বিচলিত হতে হয় না।


যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ।

যস্মিন্‌ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে।।২২

পদবিচ্ছেদ –যং লব্ধা চ অপরম্‌ লাভম্‌ মন্যতে ন অধিকম্‌ ততঃ/ যস্মিন্‌ স্থিতঃ ন দুঃখেন গুরুণা অপি বিচাল্যতে।।

শব্দার্থ –যম্‌ -যে তত্ত্ব, লব্ধা – প্রাপ্ত হলে, চ – ও, অপরম্‌ - অপরকিছুই, লাভম্‌ -লাভকে, মন্যতে – মনে করে, ন – না, অধিকম্‌ অধিক বলে, ততঃ – তা থেকে, যস্মিন্‌ যে অবস্থায়, স্থিতঃ – স্থিত হলে, ন – না, দুঃখেন –দুঃখের দ্বারা, গুরুণা – গুরুতর, অপি –ও, বিচাল্যতে – বিচলিত।

সরলার্থ – যে অবস্থা লাভ করলে অন্য কোন জাগতিক লাভকেই অধিক বলে বোধ হয় না, এবং যে অবস্থায় স্থিত হলে গুরুতর দুঃখেও যে তত্ত্ব থেকে বিচিলিত করতে পারে না, তাই যোগ।

তং বিদ্যাদ্দুঃখসংযোগবিয়োগং যোগসংজ্ঞিতম্‌।

স নিশ্চয়েন যোক্তব্যো যোগো৳নির্বিন্নচেতসা।।২৩

পদবিচ্ছেদ – তম্‌ বিদ্যাৎ দুঃখ-সংযোগ-বিয়োগম্‌ যোগ-সংজ্ঞিতম্‌/ সঃ নিশ্চয়েন যোক্তব্যঃ  যোগঃ অনির্বিন্নচেতসা।।

 

 শব্দার্থ – তম্‌ -তাকে, বিদ্যাৎ - জানা উচিত, দুঃখ-সংযোগ-বিয়োগম্‌  - দূঃখ সম্পর্কহীন, যোগ –সংঙ্গিতম্‌ - যোগতত্ত্ব, সঃ – সেই, নিশ্চয়েন – নিশ্চয় করে, যোক্তব্যঃ – অভ্যাস করা, যোগঃ – যোগ, অনির্বিন্নচেতসা – তীব্র প্রযত্ন বুদ্ধিতে।।

সরলার্থ – দুঃখসম্পর্কশূন্য সেই অবস্থার নামই যোগতত্ত্ব, এটি নিশ্চয় জেনে তীব্র প্রযত্ন সহকারে সেই যোগ অভ্যাস করবে।

সঙ্কল্পপ্রভবান্‌ কামান্‌ ত্যক্তা সর্বানশেষতঃ।

মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ।।২৪

পদবিচ্ছেদ – সংকল্প-প্রভবান কামান ত্যক্ত্বা সর্বান অশে্যতঃ মনসা এব ই ইন্দ্রিয় গ্রামম্‌ বিনিয়ম্য সমন্ততঃ।।

শব্দার্থ – সংকল্প-প্রভবান্‌ - সঙ্কল্প থেকে উৎপন্ন, কামান্‌ - কামনাকে, ত্যক্ত্বা –ত্যাগ করে, সর্বান্‌ - সকল, অশেষতঃ – নিঃশেষরূপে, মনসা – মনের দ্বারা, এব-ই, ইন্দ্রিয়-গ্রামম্‌ - ইন্দ্রিয়সকলকে, বিনিয়ম্য – নিবৃত্ত করে, সমন্ততঃ – সকল দিক থেকে।।

সরলার্থ – সংকল্পজাত যোগপ্রতিকূল সমস্ত কামনা নিঃশেষে ত্যাগ করে এবং অন্তঃকরণ দ্বারা ইন্দ্রিয়গণকে বিষয় থেকে নিবৃত্ত রেখে --

শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া।

আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ।। ২৫

পদবিচ্ছেদ –শনৈঃ শনৈঃ  উপরমেৎ বুদ্ধ্যাঃ ধৃতি-গৃহীতয়া/ আত্মসংস্থম্‌  মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিৎ অপি চিন্তয়েৎ।।

শব্দার্থ – শনৈঃ শনৈঃ – ক্রমে ক্রমে, উপরমেৎ - বিরতি, বুদ্ধ্যাঃ – বুদ্ধির দ্বারা, ধৃতি-গৃহীতয়া – ধৈর্য অবলম্বনে, আত্মসংস্থম্‌ - আত্মস্থ, মনঃ – মনকে, কৃত্বা – করে, ন – না, কিঞ্চিৎ - অন্য কিছুই, অপি –ও, চিন্তয়েৎ - চিন্তা করবে।।

সরলার্থ –ধৈর্যযুক্ত বুদ্ধির দ্বারা মনকে আত্মস্থ করে ক্রমে ক্রমে বিরতি অভ্যাস করবে। অন্য কিছুই চিন্তা করবে না।

যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চলমস্থিরম্‌।

ততস্ততো নিয়ম্যৈতদাত্মত্যেব বশং নয়েৎ।।২৬

পদবিচ্ছেদ –যতঃ যতঃ বিশ্চরতি মনঃ চঞ্চলম্‌ অস্থিরম্‌/ ততঃ ততঃ নিয়ম্য এতৎ আত্মনি এব বশম্‌ নয়েৎ।।

শব্দার্থ – যতঃ যতঃ – যে যে বিষয়ে, নিশ্চরতি – বিচরণ করে, মনঃ – মন, চঞ্চলম্‌ -চঞ্চল , অস্থিরম্‌ - অস্থির, ততঃ ততঃ – সেই সেই বিষয় থেকে, নিয়ম্য – প্রত্যাহৃত করে, এতৎ - এই  ০মনকে, আত্মনি – পরমাত্মাতে, এব –ই, বশম্‌ - স্থির, নয়েৎ - করবে।।

সরলার্থ – চঞ্চল ও অস্থির মন যে যে বিষয়ে বিচরণ করবে, সেই সেই বিষয় থেকে মনকে প্রত্যাহৃত করে পরমাত্মাতেই স্থির করবে।

প্রশান্তমনসং হ্যেনং যোগিনং সুখমুত্তমম্‌।

উপৈতি শান্তরজসং ব্রহ্মভূতমকল্মষম্‌ ।।২৭

পদবিচ্ছেদ – প্রশান্ত-মনসম্‌ হি এনম্‌ যোগিনম্‌ সুখম্‌ উত্তমম্‌/ উপৈতি শান্ত-রজসম্‌ ব্রহ্মভূতম্‌ অকল্মষম্‌ ।।

শব্দার্থ – প্রশান্ত-মনসম্‌ - বিশেষরূপে শান্তমনা, হি –কেননা, এনম্‌ - এই, যোগিনম্‌ - যোগীকে, সুখম – সুখ, উত্তমম্‌ - উত্তম, উপৈতি – প্রাপ্ত হন, শান্ত-রজসম্‌ - রজোগুণাদিশূন্য, ব্রহ্মভূতম্‌ -প্রকৃতিভূত, অকল্মষম্‌ - সর্বদোষ বর্জিত।

সরলার্থ – রজোগুণাদি বৃত্তিহীন, প্রশান্তচিত্ত ব্যক্তি সর্বদোষবর্জিত প্রকৃতিভূত হয়ে নিরতিশয় সুখ লাভ করেন।

যুঞজ়ন্নেবং সদাত্মানং যোগী বিগতকল্মষঃ।

সুখেন ব্রহ্মসংস্পর্শমত্যন্তং সুখমশ্নুতে।।২৮

পদবিচ্ছেদ –যুঞ্জন এবম্‌ সদা আত্মনম্‌ যোগী বিগত-কল্মষঃ/ সুখেন ব্রহ্ম-সংস্পর্শম্‌ অত্যন্তম্‌ সুখম্‌ অশ্নুতে।।

শব্দার্থ –যঞ্জন্‌ - যুক্ত করে, এবম্‌ - এই প্রকারে, সদা – নিরন্তর, আত্মানম্‌ - মনকে, যোগী – যোগী, বিগত-কল্মষঃ – দোষরহিত, সুখেন – অনায়াসে, ব্রহ্ম-সংস্পর্শম্‌ - প্রকৃতিভূত, অত্যন্তম্‌ - নিরতিশয়, সুখম্‌ -সুখকে, অশ্নুতে – অনুভব করেন।

সরলার্থ – নির্দোষ যোগী মনকে এই প্রকারে নিরন্তর প্রকৃতিতে যুক্ত করে প্রকৃতি সংস্পর্শজনিত পরম সুখকে অনায়াসে অনুভব করে থাকেন।

সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি।

ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ।।২৯

পদবিচ্ছেদ –সর্ব-ভূতস্থম্‌ আত্মানম্‌ সর্ব-ভূতানি চ আত্মনি ঈক্ষতে যোগ-যুক্ত-আত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ।।

শব্দার্থ – সর্ব-ভূতস্থম্‌ - সকল ভূতে স্থিত, আত্মানম্‌ - প্রকৃতিকে, সর্ব-ভূতানি – সকল ভূতকে, চ-এবং আত্মনি – প্রকৃতিকে, ঈক্ষতে – দেখে, যোগ-যুক্ত-আত্মা – যোগ যুক্ত ব্যক্তি, সর্বত্র – সর্বত্র, সমদর্শনঃ – অভেদদর্শী।।

সরলার্থ –সর্বত্র সমদর্শী সমাহিত চিত্ত ব্যক্তি সকলভূতে স্থিত প্রকৃতিকে আর প্রকৃতিতে সকল ভূত পদার্থকে দেখে থাকেন।

যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি।

তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি।।৩০

পদবিচ্ছেদ –যঃ মাম্‌ পশ্যতি সর্বত্র সর্বম্‌ চ ময়ি পশ্যতি/ তস্য অহম্‌ অ প্রণশ্যামি সঃ চ মে ন প্রণশ্যতি।।

শব্দার্থ – যঃ – যিনি, মাম্‌ - আমাকে, পশ্যতি – জানে, সর্বত্র – সর্বভূতে , সর্বম্‌ - ভূতসকলকে, চ – আর, ময়ি – আমাতে, পশ্যতি – জানে, তস্য – তার, অহম্‌ -আমি , ন প্রণশ্যামি – অদৃশ্য হই না, সঃ চ – সেও, মে –আমার, ন প্রণশ্যতি- অদৃশ্য হয় না।

সরলার্থ –যিনি পরমাত্মাস্বরূপ আমাতে সর্বভূত, ও সর্বভূতে সর্বাত্মা আমাকে জানে, আমি তাঁর অজ্ঞেয় হই না এবং তিনিও আমার  অজ্ঞেয় হয় না।

 

সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ।

সর্বথা বর্তমানো৳পি স যোগী ময়ি বর্ততে।।৩১

পদবিচ্ছেদ –সর্বভূত-স্থিতম্‌ যঃ মাম্‌ ভজতি একত্বম্‌ আস্থিতঃ সর্বথা বর্তমান অপি সঃ যোগী ময়ি বর্ততে।।

শব্দার্থ –সর্বভূত-স্থিতম্‌ সকল্ভূতে আত্মারূপে স্থিত, যঃ – যিনি, মাম্‌ - আমাকে, ভজতি – ভজনা করে, একত্বম্‌ - অভেদরূপে, আস্থিতঃ –অবস্থিত, সর্বথা – যে কোন বৃত্তিতে, বর্তমানঃ – অবস্থান করলে, অপি –ও, সঃ যোগী – সেই যোগী, ময়ি – আমাতেই , বর্ততে – অবস্থান করেন।।

সরলার্থ –যিনি সর্বভূতে অবস্থিত আমাতে নিজের সঙ্গে অভেদ জেনে ভজনা করেন, সেই যোগী যে কোন বৃত্তি অবলম্বন করুক না কেন, তিনি আমাতেই অবস্থান করেন।

আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যো৳র্জুন।

সুখং বা যদি বা দুঃখং  স যোগী পরমো মতঃ ।।৩২

পদবিচ্ছেদ –আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমম্‌ পশ্যতি যঃ অর্জুন/সুখম্‌ বা যদি দুঃখম্‌ সঃ যোগী পরমঃ মতঃ।

শব্দার্থ – আত্মৌপম্যেন – নিজের সঙ্গে তুল্যরূপে, সর্বত্র – সর্বজীবে, সমম্‌ - সমান, পশ্যতি – দেখেন, যঃ – যিনি, অর্জুন – হে অর্জুন, সুখম্‌ - সুখ, বা – এবং যদি বা – অথবা, দুঃখম্‌ - দুঃখকে, সঃ –সেই, যোগী- যোগী, পরমঃ –পরম শ্রেষ্ঠ, মতঃ – এই আমার অভিমত।।

সরলার্থ – হে অর্জুন, যে ব্যক্তি নিজের সুখ দুঃখের মতো সর্ব জীবের সুখ দুঃখ সমান বোধ করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী, এই আমার অভিমত।

                          অর্জুন উবাচ

যো৳য়ং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন।

এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম্‌।।৩৩

পদবিছেদ-যঃ অয়ম্‌ যোগঃ ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন/এতস্য অহম্‌ ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিম্‌ স্থিরাম্‌।।

শব্দার্থ –যঃ –যে, অয়ম্‌ -এই, যোগঃ –যোগ, ত্বয়া – আপনার দ্বারা, প্রোক্তঃ –কথিত হল, সাম্যেন – সমত্বরূপ, মধুসূদন – হে মধুসূদন, এতস্য – এর, অহম্‌ - আমি, ন পশ্যামি – দেখছি না, চঞ্চলত্বাৎ - চঞ্চলতাহেতু, স্থিতিম্‌ -স্থিতিকে, স্থিরাম্‌ - স্থায়ী।।

সরলার্থ –অর্জুন বললেন –হে মধুসূদন, আপনি মনের সমতারূপ যে যোগের কথা বললেন মনের চঞ্চলতাহেতু আমি এর স্থায়ী কোন স্থিতি দেখছি না।

 

চঞ্চলং হি  মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবৎ দৃঢ়ম্‌।

তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্‌।।৩৪

পদবিচ্ছেদ – চঞ্চলম্‌ হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবৎ দৃঢ়ম্‌/ তস্য অহম্‌ নিগ্রহম, মন্যে বায়োঃ ইব সুদুষ্করম্‌।।

শব্দার্থ – চঞ্চলম্‌ -অত্যন্ত চঞ্চল, হি – কেন না, মনঃ – মন, কৃষ্ণ – হে কৃষ্ণ, প্রমাথি -  ইন্দ্রিয়ের বিক্ষোভকর, বলবৎ - বলবান,দৃঢ়ম –দৃঢ়, তস্য – তাকে, অহম্‌ - আমি, নিগ্রহম্‌ - বশ করা,  মন্যে – মনে করি,বায়োঃ –বায়ুর, ইব –ন্যায়,সুদুষ্করম্‌ – অতি দুষ্কর।।             

সরলার্থ – হে কৃষ্ণ, মন স্বভাবতই চঞ্চল , ইন্দ্রিয়গণের ক্ষোভকারক বলবান ও দৃঢ। যেমন বায়ুকে নিরুদ্ধ করা অতি কঠিন, মনকে বশীভূত করাও তেমন দুষ্কর বলে মনে হচ্ছে।

                      শ্রীভগবান উবাচ

অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্‌।

অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেন চ গৃহ্যতে।।৩৫

পদবিচ্ছেদ –অসংশয়ম্‌ মহাবাহো মনঃ দুর্নিগ্রহম্‌ চলম্‌/ অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে।।

শব্দার্থ – অসংশয়ম্‌ – সংশয় নেই, মহাবাহো –হে মহাবাহো, মনঃ –মন, দুর্নিগ্রহম,  -দুর্নিগ্রহ, চলম্‌ – চঞ্চল, অভ্যাসেন – অভ্যাসের দ্বারা, তু – কিন্তু, কৌন্তেয় – হে কৌন্তেয়, বৈরাগ্যেণ- বৈরাগ্যের দ্বারা, চ – ও, গৃহ্যতে – সংযত হয়।

সরলার্থ –শ্রীভগবান বললেন – হে মহাবাহো, মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল এতে কোন সংশয় নেই। কিন্তু হে কুন্তিপুত্র, অভ্যাস ও বৈরাগ্য অবলম্বন দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়।

 

অসংযতাত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ।

বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যো৳বাপ্তুমুপায়তঃ।।৩৬

পদবিচ্ছেদ –অসংযত-আত্মনা যোগঃ দুষ্প্রাপঃ ইতি মে মতিঃ/ বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যঃ অবাপ্তুম্‌ উপায়তঃ।।

শব্দার্থ –অসংযত-আত্মনা – অবশীভূত চিত্ত, যোগঃ –যোগ, দুষ্প্রাপঃ – দুষ্প্রাপ্য, ইতি –এই, মে – আমার, মতিঃ – অভিমত, বশ্যাত্মনা, সংযত চিত্ত ব্যক্তি, তু – কিন্তু, যততা – যত্নশীল, শক্যঃ – সমর্থ হন, অবাপ্তুম্‌ - লাভ করতে, উপায়তঃ – যথোক্ত উপায়ে।।

সরলার্থ – যার মন বশীভূত নয়, যোগলাভ করা তার পক্ষে দুষ্প্রাপ্য, এই আমার অভিমত। কিন্তু সংযতচিত্ত ব্যক্তি যথোক্ত উপায় অবলম্বন করে যত্নশীল হলে যোগলাভ করতে পারেন।

                           অর্জুন উবাচ

অযতিঃ শ্রদ্ধয়োপেতো যোগাচ্চলিত্মানসঃ।

অপ্রাপ্য যোগসংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি।।৩৭

পদবিচ্ছেদ –অযতিঃ শ্রদ্ধয়া উপেতঃ যোগাৎ চলিত-মানসঃ/ অপ্রাপ্য যোগ-সংসিদ্ধিম্‌ কাম্‌ গতিম্‌ কৃষ্ণ গচ্ছতি।।

শব্দার্থ –অযতিঃ –যত্নহীন, শ্রদ্ধয়া উপেতঃ –শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি, যোগাৎ -যোগ থেকে, চলিত-মানসঃ –ভ্রষ্ট হয়, অপ্রাপ্য – না পেয়ে, যোগ-সংসিদ্ধিম্‌ - যোগের সিদ্ধিকে, কাম্‌ -কি, গতিম্‌ - অবস্থা, কৃষ্ণ – হে কৃষ্ণ, গচ্ছতি –পেয়ে থাক্বে।

সরলার্থ – অর্জুন বললেন – হে কৃষ্ণ, যে ব্যক্তি প্রথমে শ্রদ্ধাবান্‌ , কিন্তু পরে যত্নহীন হয়ে যদি যোগপথ থেকে ভ্রষ্ট হয়, সে ব্যক্তি যোগসিদ্ধি প্রাপ্ত না হয়ে কী গতি প্রাপ্ত হয়?

 

কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টশ্ছিন্নাভ্রমিব নশ্যতি।

অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমূঢ়ো ব্রহ্মণঃ পথি।।৩৮

পদবিচ্ছেদ –কচ্চিৎ ন উভয়-বিভ্রষ্টঃ ছিন্ন-অভ্রম্‌ ইব নশ্যতি/ অপ্রতিষ্ঠঃ মহাবাহো বিমূঢ়ঃ ব্রহ্মণঃ পথি।।

শব্দার্থ –কচ্চিৎ - কি, ন-না, উভয়-বিভ্রষ্টঃ – উভয় পথ থেকে, ছিন্ন-অভ্রম্‌ -ছিন্ন মেঘের মতো, ইব –ই, নশ্যতি-নষ্ট হয়ে, অপ্রতিষ্ঠঃ –আশ্রয়হীন, মহাবাহো – হে মহাবাহো, বিমূঢ়ঃ – বিমূঢ়, ব্রহ্মণঃ –ব্রহ্মপ্রাপ্তি, পথি – পথ থেকে।।

সরলার্থ – হে মহাবাহো, সে ব্যক্তি কি যোগপথ ও কর্মপথ উভয় পথ থেকে ভ্রষ্ট, নিরাশ্রয় ও ব্রহ্মলাভের উপায়স্বরূপ পথে বিমূঢ় হয়ে ছিন্ন মেঘের ন্যায় কি বিনাশ প্রাপ্ত হয়?

 

এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ।

ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা ন হ্যুপপদ্যতে।।৩৯

পদবিচ্ছেদ – এতৎ মে সংশয়ম্‌ কৃষ্ণ ছেত্তুম্‌ অর্হসি অশেষতঃ ত্বদন্যঃ সংশয়স্য অস্য ছেত্তা ন হি উপপদ্যতে।।

শব্দার্থ –এতৎ - এই, মে- আমার, সংশয়ম্‌ -সংশয়কে, কৃষ্ণ- হে কৃষ্ণ, ছেত্তুম্‌ -ছেদন করতে, অর্হসি –যোগ্য, অশেষতঃ – বিশেষরূপে,ত্বদন্যঃ –আপনি ভিন্ন, সংশয়স্য – সংশয়ের, অস্য –এই, ছেত্তা – ছেদনকারী, ন-নয়, হি – যেহেতু, উপপদ্যতে – উপযুক্ত।।

সরলার্থ – হে কৃষ্ণ, আমার এই সন্দেহ সম্পূর্ণ রূপে দূর করতে একমাত্র আপনিই উপযুক্ত। নিশচয়ই আপনি ভিন্ন অন্য কেউ এই সংশয় দূর করার যোগ্য নয়।

            শ্রীভগবান উবাচ

পার্থ নৈবেহ নামূত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে।

ন হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত গচ্ছতি।।৪০

পদবিচ্ছেদ –পার্থ ন এব ইহ ন অমুত্র বিনাশঃ তস্য বিদ্যতে / ন  হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিম্‌ তাত গচ্ছতি।

শব্দার্থ – পার্থ –হে পার্থ, ন – না, এষ- ই, ইহ- ইহলোকে, ন- না, অমুত্র –পরলোকে, বিনাশঃ – নাশ, তস্য – তার, বিদ্যতে- হয়, ন – না, হি –কেন না, কল্যাণকৃৎ -শুভকর্মকারী, কশ্চিৎ -কেউই, দুর্গতিম্‌ - অধোগতি, তাত – হে প্রিয়, গচ্ছতি – প্রাপ্ত হয়।।

সরলার্থ –শ্রীভগবান বললেন – হে পার্থ , যোগভ্রষ্ট ব্যক্তির ইহলোক অধোগতি বা পরলোকে নরকাদিতে বাস এসব কিছুই হয় না, কারণ  কোন শুভকর্মকারী ব্যক্তি দুর্গতি প্রাপ্ত হন না।

প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লোকানুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ।

শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টো৳ভি জায়তে।।৪১

পদবিচ্ছেদ – প্রাপ্য পুণ্য-কৃতাম্‌ লোকান্‌ উষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ /শুচীনাম্‌ শ্রীমতাম্‌ গেহে যোগভ্রষ্টঃ  অভিজায়তে।।

শব্দার্থ –প্রাপ্য –প্রাপ্ত হয়ে, পুণ্য-কৃতাম্‌ - পুণ্যবানদের,লোকান্‌ -স্বর্গাদি লোক সমূহ, উষিত্বা – বাস করে, শাশ্বতীঃ – বহুকাল, সমাঃ – বছর, শুচীনাম্‌ -শুদ্ধাচারী, শ্রীমতাম্‌ - পরমার্থ ধনে ধনীর, গেহে –গৃহে, যোগভ্রষ্টঃ –যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি, অভিজায়তে – জন্মগ্রহণ করে থাকে।

সরলার্থ –যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি পুণ্যকারীদের প্রাপ্য স্বর্গাদি লোকে বহু বছর অবস্থান করে পবিত্র ও পরমার্থ ধনে ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করে থাকে।

অথবা যোগিনামেব কুলে ভবতি ধীমতাম্‌।

এতদ্ধি দুর্লভতরং লোকে জন্ম যদীদৃশম্‌।।৪২

পদবিচ্ছেদ – অথবা যোগিনাম্‌ এব কুলে ভবতি ধীমতাম্‌/ এতৎ হি দুর্লভতরম্‌ লোকে জন্ম যৎ ঈদৃশম্‌।।

শব্দার্থ –অথবা – অথবা, যোগিনাম্‌ -যোগিদের, এব-ই, কুলে –কুলে, ভবতি –জন্মগ্রহণ করে, ধীমতাম্‌ -জ্ঞানবান, এতৎ -এই, হি –নিশ্চয়ই, দুর্লভতরম্‌ - অতি দুর্লভ, লোকে – সংসারে, জন্ম – জন্ম, যৎ - যে,ঈদৃশম্‌ -এরূপ।।

সরলার্থ – অথবা জ্ঞানবান যোগীদের কুলে জন্মগ্রহণ করেন, এরূপ যে জন্ম তা ইহলোকে খুবই দুর্লভ।

 

তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্বদেহিকম্‌।

যততে চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন।।৪৩

পদবিচ্ছেদ – তত্র তম্‌ বুদ্ধি-সংযোগম্‌ লভতে পৌর্বদেহিকম্‌ যততে চ ততঃ ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন।।

শব্দার্থ – তত্র – সেস্থানে, তম্‌ -সে, বুদ্ধি-সংযোগম্‌ -শুভবুদ্ধির, লভতে – লাভ করে, পৌর্ব-দেহিকম্‌ - পূর্বদেহজাত, যততে – যত্ন করে, চ – এবং, ততঃ –তার প্রভাবে, ভূয়ঃ – পুনরায়, সংসিদ্ধৌ – সিদ্ধিলাভের জন্য, কুরুনন্দন – হে কুরুনন্দন।।

সরলার্থ – হে কুরুনন্দন, যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি সেই জন্মে পূর্বদেহজাত সংস্কার বসে শুভবুদ্ধির জ্ঞান-সংযোগ লাভ করে এবং মুক্তিলাভ বিষয়ে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর যত্ন করে থাকে।

 

পূর্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশো৳পি সঃ।

জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মতিবর্ততে।।৪৪

পদবিচ্ছেদ – পূর্ব-অভ্যাসেন তেন এব হ্রিয়তে হি অবশঃ অপি সঃ/ জিজ্ঞাসুঃ অপি যোগস্য শব্দব্রহ্ম  অতিবর্ততে।।

শব্দার্থ – পূর্ব-অভ্যাসেন – পূর্ব জন্মের অভ্যাসের ফলে, তেন – সে, এব-ই, হ্রিয়তে –আকৃষ্ট হয়, হি –অবশ্যই, অবশঃ – অবশ হয়ে, অপি –ও, সঃ – সেই যোগভ্রষ্ট, জিজ্ঞাসুঃ – জানতে ইচ্ছুক, অপি – ও, যোগস্য – যোগের, শব্দব্রহ্ম – বেদোক্ত কর্মফলকে, অতিবর্ততে – অতিক্রম করে থাকেন।।

 

সরলার্থ – যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি কোন অন্তরায় বশতঃ ইচ্ছা না করলেও পূর্বজন্মকৃত অভ্যাসই অবশ করে তাকে ব্রহ্মনিষ্ঠ করে, তখন তিনি যোগজিজ্ঞাসু হয়েও বেদোক্ত কর্মফলকে অতিক্রম করে অধিকতর ফল লাভ করেন।

 

প্রযত্নাদ্‌ যতমানস্তু যোগী সংশুদ্ধকিল্বিষঃ।

অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততো যাতি পরাং গতিম্‌।।৪৫

পদবিচ্ছেদ –প্রযত্নাৎ যতমানঃ তু যোগী সংশুদ্ধ-কিল্বিষঃ/ অনেক-জন্ম-সংসিদ্ধঃ ততঃ যাতি পরাম্‌ গতিম্‌।।

শব্দার্থ – প্রযত্নাৎ - পূর্বকৃত যত্ন অপেক্ষা, যতমানঃ –অধিক যত্নশীল, তু –কিন্তু, যোগী – যোগী, সংশুদ্ধ-কিল্বিষঃ –নিষ্পাপ হয়ে, অনেক-জন্ম-সংসিদ্ধঃ –বহু জন্মের সংস্কার, ততঃ – তারপরে, যাতি –প্রাপ্ত হন, পরাম্‌ - পরম, গতিম্‌ -মোক্ষ।।

সরলার্থ – প্রযত্ন পূর্বক অভ্যাস করতে করতে পূর্বকৃত যত্ন অপেক্ষা অধিক যত্নশীল নিষ্পাপ যোগী জন্মান্তরের সংস্কার সকল পরিত্যাগ করে পরমগতি মোক্ষ লাভ করেন।

 

তপস্বিভ্যো৳ধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যো৳পি মতো৳ধিকঃ ।

কর্মিভ্যশ্চাধিকো যোগী তস্মাদ্‌ যোগী ভবার্জুন।।৪৬

পদবিচ্ছেদ –তপস্বিভ্যঃ অধিকঃ যোগী জ্ঞানিভ্যঃ অপি মতঃ অধিকঃ কর্মিভ্যঃ চ অধিকঃ যোগী তস্মাৎ যোগী ভব অর্জুন।।

শব্দার্থ – তপস্বিভ্যঃ –তপস্বিগণ থেকে, অধিকঃ – শ্রেষ্ঠ, যোগী- যোগী, জ্ঞানিভ্যঃ – শাস্ত্রজ্ঞ থেকে, অপি –ও, মতঃ – অভিমত, অধিকঃ – শ্রেষ্ঠ, কর্মিভ্যঃ – সকাম কর্মি থেকে, চ- এবং, অধিকঃ –শ্রেষ্ঠ, যোগী – যোগী, তস্মাৎ - সে জন্য, যোগী – যোগী, ভব – হও, অর্জুন – হে অর্জুন।।

সরলার্থ – হে অর্জুন, আমার মতে যোগী তপস্বী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, শাস্ত্রজ্ঞানী অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ এবং সকাম কর্মী অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। সে হেতু তুমি যোগী হও।

            যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা।

শ্রদ্ধাবান্‌ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ।। ৪৭

পদবিচ্ছেদ –যোগিনাম্‌ অপি সর্বেসাম্‌ মদ্গতেন অন্তরাত্মনা/ শ্রদ্ধাবান্‌ ভজতে যঃ মাম্‌ সঃ মে যুক্ততমঃ মতঃ।।

শব্দার্থ – যোগিনাম্‌ - যোগিদের মধ্যে, অপি –ও, সর্বেষাম্‌ -সকল, মদ্গতেন – মদ্গতচিত্ত, অন্তরাত্মনা – অন্তরাত্মা দ্বারা, শ্রদ্ধাবান্‌ - শ্রদ্ধাযুক্ত, ভজতে – ভজনা করে, যঃ – যিনি, মাম্‌ - আমাকে, সঃ –সেই যোগী, মে – আমার, যুক্ততমঃ – পরম শ্রেষ্ঠ, মতঃ – মতে।।

সরলার্থ –যোগিদের মধ্যেও যাঁরা সকল প্রকারে আমাতে চিত্ত সমর্পণ করে আন্তরিক শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে আমাকে ভজনা করেন, তাঁরাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ যোগী

                               ।।  ওঁ তৎ সৎ ।।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                            

Comments

  1. গীতার মধ্যে এত কিছু আছে জানতাম না যদি না শিক্ষা গুরু দেব ব্যাখ্যা করে আমাদের বলতো জয় শিক্ষা গুরু দেব এর জয়

    ReplyDelete
  2. সোমা চ্যাটার্জি, চন্দননগর,মহারাজ প্রত্যেক কথার অর্থ করে এমন সুন্দর করে দিয়েছেন তাতে খুব উপকৃত হলাম

    ReplyDelete
  3. খুব ভালো লাগলো🙏🙏🙏 প্রণাম মহারাজ🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  4. মহারাজ আপনাকে প্রণাম করি।আপনি গীতা ব্যাখ্যা এত সহজ সরল ভাবে যেভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন এটা আমাদের সমৃদ্ধ হ ওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। গীতা বহু দিন যাবৎ পড়ি কিন্তু গীতা ভিতরে কি অমূল্য সম্পদ রয়েছে সেটাএখন কিছুটা বুঝতে পারছি।জীবনের প্রতি পদক্ষেপে গীতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া কোন কিছু ভাবি না,কোন কিছু দেখি না।কোন কিছুই শুনি না।কোন কিছু বলি না।তুমি একে আলোর দিকে নিয়ে চল প্রভু।মহারাজ আপনার প্রতি টা ক্লাস করি।এবং ভীষন ভাল লাগে।আমার কাছে 4.30মি সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোন ভুল হলে ক্ষমা করবেন।ভাল থাকবেন।

    ReplyDelete
  5. Pronam maharaj.sampurna Geeta jadi eibhabe likhe den khub upokrito hobo. eto sundar kore Porte pacchi.

    ReplyDelete

Post a Comment